চোখের জলে বিদায়, নতুন অধ্যায়ের পথে মির্জা ফখরুল
- আপডেট সময় ০২:২৪:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৫৪৪ বার পড়া হয়েছে
রাজনীতিতে কিছু বিদায় শেষের গল্প বলে না; বরং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দলীয় নেতৃত্ব থেকে বিদায় তেমনই একটি মুহূর্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সহযাত্রীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর চোখে যে পানি দেখা গেছে, সেখানে যেমন বিচ্ছেদের আবেগ আছে, তেমনি রয়েছে নতুন দায়িত্বের প্রত্যাশাও।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করে মির্জা ফখরুল এখন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দলীয় রাজনীতির সক্রিয় নেতৃত্ব থেকে সরে গিয়ে তিনি যদি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হন, তাহলে এটি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
এ কারণে তাঁর বিদায়কে কেবল ‘বিদায়’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির ইতিবাচক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। বরং এটি হওয়া উচিত দায়িত্বের পরিবর্তন, অভিজ্ঞতার উত্তরণ এবং বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার নতুন সুযোগ।
আবেগের বিদায়, আশার নতুন যাত্রা
মির্জা ফখরুলের বিদায়ী মুহূর্তের কান্না অনেকের মনে আবেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের সহকর্মী, নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক সহযাত্রীদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া সহজ নয়। রাজনীতির মাঠে বছরের পর বছর একসঙ্গে পথচলার পর যখন দায়িত্বের কারণে সেই সম্পর্কের একটি পরিচিত অধ্যায় শেষ হয়, তখন আবেগ আসাটাই স্বাভাবিক।
এই কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং এটি তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা এবং সহকর্মীদের প্রতি আন্তরিকতার প্রকাশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
রাজনীতি অনেক সময় কঠিন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং সংঘাতময় হয়ে ওঠে। তার মধ্যেও মানবিকতা ধরে রাখা একজন নেতার গুরুত্বপূর্ণ গুণ। মির্জা ফখরুলের বিদায়ের মুহূর্ত সেই মানবিকতারই একটি প্রকাশ।
দলীয় নেতা থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের পথে
একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়া নিঃসন্দেহে বড় দায়িত্ব। কারণ দলীয় রাজনীতিতে একজন নেতা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ ও দলের পক্ষে কাজ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে গিয়ে তাঁকে সব রাজনৈতিক মত ও পথের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়।
মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির নানা উত্থান-পতন দেখেছেন। বিরোধী দলের রাজনীতি করেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছেন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন।
এই অভিজ্ঞতা যদি তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে তাঁর সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন নতুন মাত্রা পেতে পারে।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবার রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
১৯৯১ সালে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর একক প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর সংসদে ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।
এবার বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ফলে এবার সংসদ সদস্যদের সামনে একাধিক বিকল্প রয়েছে। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক একটি দিক।
গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যবস্থা নয়; এর সঙ্গে মতের বৈচিত্র্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিকল্পের উপস্থিতিও জড়িত। সেই অর্থে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণে ফখরুল
সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের জয়ের সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি আরও অর্থবহ হয়েছে। জয়-পরাজয়ের বাইরে এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন।
অলি আহমদের প্রার্থিতাকেও তাই ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। কারণ একটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলে নির্বাচিত ব্যক্তির দায়িত্বের রাজনৈতিক ভিত্তিও আরও স্পষ্ট হয়।
রাষ্ট্রপতি হলে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা। এটি অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জ, কিন্তু একই সঙ্গে একটি বড় সুযোগ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতের পার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হলো সেই পার্থক্যের মধ্যেও সাংবিধানিক ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখা। মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে এই দায়িত্ব পালনে সহায়তা করতে পারে।
তিনি যদি সব দলের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন এবং নাগরিকদের কাছে আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেন, তাহলে তাঁর নতুন দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হয়ে উঠবে।
বিএনপির জন্যও নতুন সুযোগ
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়া বিএনপির জন্যও একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করবে। দীর্ঘদিনের মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে তিনি সরে গেলে দলের নেতৃত্বে নতুন মুখ আসবে। নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে বিএনপি তার সাংগঠনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেতে পারে।
একটি বড় রাজনৈতিক দলের জন্য নেতৃত্বের পরিবর্তন কখনো কখনো নতুন চিন্তা, নতুন কর্মপদ্ধতি এবং নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি করে। তাই ফখরুলের বিদায়কে শুধু শূন্যতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই; এটি বিএনপির জন্য নেতৃত্ব বিকাশের একটি নতুন সুযোগও হতে পারে।
রাজনীতির অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের সম্পদ হতে পারে
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হতে পারে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রপতির পদে এমন একজন ব্যক্তি গেলে, যিনি দীর্ঘদিন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মনস্তত্ত্ব, সংকট ও সম্ভাবনা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে ভালো ধারণা রাখবেন।
এই অভিজ্ঞতা যদি তিনি দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাহলে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির পদে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে- রাজনীতিকে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতাকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের কাজে লাগানো।
বিদায় মানেই বিচ্ছেদ নয়
মির্জা ফখরুলের চোখের জলকে তাই বিচ্ছেদের প্রতীক হিসেবে না দেখে পরিবর্তনের আবেগ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
একজন নেতা তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক ভূমিকা ছেড়ে নতুন দায়িত্বের পথে যাচ্ছেন। পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না; বরং সম্পর্কের ধরন বদলাচ্ছে।
রাজনীতিতে পদ পরিবর্তন স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো- নতুন পদে গিয়ে একজন মানুষ কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। মির্জা ফখরুলের সামনে সেই সুযোগ এখন তৈরি হয়েছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ একজন নেতা যদি দলীয় রাজনীতির সীমারেখা অতিক্রম করে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বে আসেন, সেটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
মির্জা ফখরুলের চোখের জলের বিদায় তাই দুঃখের শেষ দৃশ্য নয়। এটি হতে পারে অভিজ্ঞতার নতুন ব্যবহারের সূচনা।
দলীয় রাজনীতির মঞ্চ তাঁকে যে অভিজ্ঞতা দিয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা যদি তিনি রাষ্ট্রের কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে তাঁর নতুন দায়িত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাঁর সামনে এখন একটি বড় সুযোগ- নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিচয়কে অতিক্রম করে সবার আস্থার রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদ কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়- এটি রাষ্ট্রের পদ। আর সেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে গিয়ে মির্জা ফখরুল যদি সংবিধান, গণতন্ত্র, মানবিকতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন, তাহলে তাঁর এই অশ্রুসিক্ত বিদায় হয়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
চোখের জলে বিদায়, কিন্তু সামনে সম্ভাবনার নতুন পথ- মির্জা ফখরুলের জন্য, বিএনপির জন্য এবং বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রিন্ট




















