ঢাকা ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব Logo ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল Logo আজ দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন Logo ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত Logo ভারতের কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের মৃত্যু : সবাই বাংলাদেশি Logo বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান : শামা ওবায়েদ ইসলাম। Logo ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী Logo ওমানে ভয়াবহ হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প : ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান Logo দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)- এর নতুন চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান Logo স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে

শিক্ষকের হাতেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০১:৫২:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৫০৯ বার পড়া হয়েছে

একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন, তখন তিনি কেবল একটি বিষয়ের জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করেন না; তিনি আসলে একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজে যুক্ত থাকেন। একজন ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেন না- তিনি যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখান, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখান, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখান এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার বোধ জাগিয়ে তোলেন। তাই শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি মানুষ ও সমাজ নির্মাণের এক গভীর নৈতিক দায়িত্ব।

এই জায়গা থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার ঘটনাটিকে দেখার একটি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট; তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন।

মির্জা ফখরুলের এই পথচলার শুরু রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নয়, শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭২ সালে তিনি শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতি পড়ান। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর তিনি ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষ থেকে রাজনীতি, স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিত্ব থেকে একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব- দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। এই যাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো- একজন সাবেক শিক্ষক রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে এসে তাঁর শিক্ষকসত্তাকে কতটা কাজে লাগাতে পারবেন?

কারণ রাষ্ট্রপতির পদ আর দশটি রাজনৈতিক পদের মতো নয়। একজন রাজনৈতিক নেতা একটি দলের কর্মসূচি, আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই পরিচয়ের পরিধি অনেক বড় হয়ে যায়। তখন তিনি কেবল কোনো দলের নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ফলে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে সংবিধান, ব্যক্তিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যকে স্থান দেওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

এখানেই তাঁর শিক্ষক পরিচয় নতুন তাৎপর্য বহন করতে পারে।

একজন শিক্ষক জানেন- একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী এক রকম নয়। কারও মেধা বেশি, কারও কম; কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নেয়; কেউ প্রশ্ন করে, কেউ নীরবে শোনে। কিন্তু শিক্ষককে প্রত্যেকের জন্যই জায়গা তৈরি করতে হয়। একজন ভালো শিক্ষক দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাদ দেন না, বরং তাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রও তেমনই। এখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য থাকবে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা সমান।

একজন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্বগুলোর একটি হলো সেই সমতার চেতনাকে ধারণ করা।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন, অবিশ্বাস ও সংঘাতের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু মতপার্থক্য যখন পারস্পরিক শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন রাজনীতি তার গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য হারাতে শুরু করে। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার আকাঙ্ক্ষা যখন প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতায় রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থা।

এই বাস্তবতায় একজন সাবেক শিক্ষকের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি।

শিক্ষক জানেন, কোনো সমস্যার সমাধান শুধু শক্তি প্রয়োগে হয় না; প্রয়োজন যুক্তি, সংলাপ ও বোঝাপড়া। তিনি জানেন, একটি প্রশ্নের একাধিক উত্তর থাকতে পারে। তিনি জানেন, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করাই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। ছাত্রজীবনের রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, সংসদীয় রাজনীতি, মন্ত্রিত্ব এবং বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ নেতৃত্ব- সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার বহু স্তর প্রত্যক্ষ করেছেন। ২০০১ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন; ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে তাঁর জন্য একটি বড় সম্পদ হতে পারে। তিনি জানেন আন্দোলন কী, বিরোধী রাজনীতি কী, রাজনৈতিক সংকটের অভিঘাত কী এবং একটি রাজনৈতিক দলের সংগঠন কীভাবে কাজ করে। কিন্তু একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও তৈরি করেছে।

কারণ এখন তাঁকে দলীয় রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের পরিচয়কে সামনে আনতে হবে।

রাজনীতিতে পক্ষ থাকে, রাষ্ট্রে নাগরিক থাকে। রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে, রাষ্ট্রে নাগরিক থাকে। রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকে, রাষ্ট্রে থাকে প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানের ধারাবাহিকতা। এই পার্থক্যটি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিক্ষক নিজের প্রিয় শিক্ষার্থী ও কম প্রিয় শিক্ষার্থীর মধ্যে ন্যায়বিচারের পার্থক্য করতে পারেন না। তাঁর দায়িত্ব হলো সবার জন্য একই শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক, বিরোধী দলের কর্মী, রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিক কিংবা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সমালোচক- সবাই রাষ্ট্রের নাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে তাদের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধ- সবকিছুর সমন্বয়েই একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়।

আর এই জায়গায় একজন শিক্ষক অন্য অনেকের চেয়ে ভিন্নভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। কারণ তিনি জানেন, আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। শ্রেণিকক্ষের একটি ছেলে বা মেয়ে একদিন প্রশাসক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, বিচারক কিংবা রাজনীতিক হতে পারে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কাজ।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের কাছে তাই প্রত্যাশা থাকতে পারে- তিনি যেন শিক্ষা, মানবিকতা, নৈতিকতা ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে জাতীয় আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন।

আজকের তরুণরা শুধু চাকরি চায় না; তারা মর্যাদা চায়। তারা শুধু উন্নয়ন চায় না; তারা ন্যায়বিচার চায়। তারা শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ চায় না; তারা চায় যোগ্যতার মূল্যায়ন, নিরাপদ পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তরুণদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা তাই আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত- এটি সাংবিধানিক বাস্তবতা। কিন্তু নৈতিক নেতৃত্বের শক্তি সব সময় সাংবিধানিক ক্ষমতার হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য, আচরণ, সংযম, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং জাতীয় সংকটে তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তৈরি করতে পারে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; তার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাতেও। জনগণ যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আর প্রতিষ্ঠান যদি মানুষের আস্থা হারায়, তাহলে ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোন, রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।

এখানেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেকটা একজন শিক্ষকের মতো। শিক্ষক সব প্রশ্নের উত্তর নিজে দেন না; বরং শিক্ষার্থীকে এমনভাবে প্রস্তুত করেন, যাতে সে নিজেই উত্তর খুঁজে নিতে পারে। একইভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেশের প্রতিটি সমস্যার প্রশাসনিক সমাধান করা নয়। বরং সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বাংলাদেশের সামনে এখন অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বহু চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে সংযম, প্রজ্ঞা, ভারসাম্য এবং আস্থা সৃষ্টির সক্ষমতা।

বিশেষ করে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে না দেখা, সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে না চিহ্নিত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সহিংসতার পরিবর্তে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করা- একটি পরিণত রাষ্ট্রের অন্যতম পূর্বশর্ত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে তাই একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। তাঁর অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে দলীয় রাজনীতির বাইরে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।

২০ আগস্টের নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন একই দিন তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেটও প্রকাশ করেছে। এখন তাঁর সামনে ভোটের হিসাব নয়, ইতিহাসের হিসাব। আগামী দিনে তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ধারিত হবে তিনি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব কতটা নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে পারেন তার ওপর।

শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি- এই যাত্রা তাই শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি একটি প্রতীকের গল্পও। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করেন; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন রাষ্ট্রপতি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কৃতিতে আস্থার ভিত্তি শক্ত করতে পারেন।

সুতরাং আজকের প্রত্যাশা কেবল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে নয়; প্রত্যাশা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে, গণতন্ত্রকে ঘিরে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ঘিরে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে।

মির্জা ফখরুল যদি তাঁর শিক্ষকসুলভ ধৈর্য, যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও সংযমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে কাজে লাগাতে পারেন, তবে তাঁর নতুন অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অর্থবহ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

কারণ রাষ্ট্র কেবল আইন, ভবন, প্রশাসন কিংবা ক্ষমতার কাঠামোর নাম নয়। রাষ্ট্র হলো মানুষ, মানুষের অধিকার, মানুষের স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠান। আর মানুষ গড়ার প্রথম কারিগরদের অন্যতম হলেন শিক্ষক।

তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়- যে মানুষ একদিন শ্রেণিকক্ষে মানুষ গড়ার পাঠ দিয়েছেন, তিনি কি এবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর শ্রেণিকক্ষে আস্থা, সহনশীলতা, ন্যায়, মানবিকতা ও সাংবিধানিক মর্যাদার পাঠ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন?

সময়ের বিচারেই মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর। তবে প্রত্যাশা থাকতেই পারে- শিক্ষকের হাতেই যেন থাকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের নৈতিক দিশা।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে

শিক্ষকের হাতেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ

আপডেট সময় ০১:৫২:৪৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন, তখন তিনি কেবল একটি বিষয়ের জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করেন না; তিনি আসলে একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজে যুক্ত থাকেন। একজন ভালো শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেন না- তিনি যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখান, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখান, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখান এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার বোধ জাগিয়ে তোলেন। তাই শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয়; এটি মানুষ ও সমাজ নির্মাণের এক গভীর নৈতিক দায়িত্ব।

এই জায়গা থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়ার ঘটনাটিকে দেখার একটি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট; তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন।

মির্জা ফখরুলের এই পথচলার শুরু রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নয়, শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৭২ সালে তিনি শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজে অর্থনীতি পড়ান। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পর তিনি ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষ থেকে রাজনীতি, স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিত্ব থেকে একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব- দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে। এই যাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো- একজন সাবেক শিক্ষক রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে এসে তাঁর শিক্ষকসত্তাকে কতটা কাজে লাগাতে পারবেন?

কারণ রাষ্ট্রপতির পদ আর দশটি রাজনৈতিক পদের মতো নয়। একজন রাজনৈতিক নেতা একটি দলের কর্মসূচি, আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই পরিচয়ের পরিধি অনেক বড় হয়ে যায়। তখন তিনি কেবল কোনো দলের নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ফলে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে সংবিধান, ব্যক্তিগত অবস্থানের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে জাতীয় ঐক্যকে স্থান দেওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

এখানেই তাঁর শিক্ষক পরিচয় নতুন তাৎপর্য বহন করতে পারে।

একজন শিক্ষক জানেন- একটি শ্রেণিকক্ষে সব শিক্ষার্থী এক রকম নয়। কারও মেধা বেশি, কারও কম; কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নেয়; কেউ প্রশ্ন করে, কেউ নীরবে শোনে। কিন্তু শিক্ষককে প্রত্যেকের জন্যই জায়গা তৈরি করতে হয়। একজন ভালো শিক্ষক দুর্বল শিক্ষার্থীকে বাদ দেন না, বরং তাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রও তেমনই। এখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য থাকবে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা সমান।

একজন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় নৈতিক দায়িত্বগুলোর একটি হলো সেই সমতার চেতনাকে ধারণ করা।

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে বিভাজন, অবিশ্বাস ও সংঘাতের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু মতপার্থক্য যখন পারস্পরিক শত্রুতায় পরিণত হয়, তখন রাজনীতি তার গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য হারাতে শুরু করে। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার আকাঙ্ক্ষা যখন প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতায় রূপ নেয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানুষের পারস্পরিক আস্থা।

এই বাস্তবতায় একজন সাবেক শিক্ষকের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি।

শিক্ষক জানেন, কোনো সমস্যার সমাধান শুধু শক্তি প্রয়োগে হয় না; প্রয়োজন যুক্তি, সংলাপ ও বোঝাপড়া। তিনি জানেন, একটি প্রশ্নের একাধিক উত্তর থাকতে পারে। তিনি জানেন, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করাই শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। ছাত্রজীবনের রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, সংসদীয় রাজনীতি, মন্ত্রিত্ব এবং বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ নেতৃত্ব- সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার বহু স্তর প্রত্যক্ষ করেছেন। ২০০১ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন; ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে তাঁর জন্য একটি বড় সম্পদ হতে পারে। তিনি জানেন আন্দোলন কী, বিরোধী রাজনীতি কী, রাজনৈতিক সংকটের অভিঘাত কী এবং একটি রাজনৈতিক দলের সংগঠন কীভাবে কাজ করে। কিন্তু একই সঙ্গে এই অভিজ্ঞতাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও তৈরি করেছে।

কারণ এখন তাঁকে দলীয় রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের পরিচয়কে সামনে আনতে হবে।

রাজনীতিতে পক্ষ থাকে, রাষ্ট্রে নাগরিক থাকে। রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে, রাষ্ট্রে নাগরিক থাকে। রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকে, রাষ্ট্রে থাকে প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানের ধারাবাহিকতা। এই পার্থক্যটি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন শিক্ষক নিজের প্রিয় শিক্ষার্থী ও কম প্রিয় শিক্ষার্থীর মধ্যে ন্যায়বিচারের পার্থক্য করতে পারেন না। তাঁর দায়িত্ব হলো সবার জন্য একই শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক, বিরোধী দলের কর্মী, রাজনীতির বাইরে থাকা নাগরিক কিংবা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সমালোচক- সবাই রাষ্ট্রের নাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে তাদের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবিক মূল্যবোধ- সবকিছুর সমন্বয়েই একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়।

আর এই জায়গায় একজন শিক্ষক অন্য অনেকের চেয়ে ভিন্নভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। কারণ তিনি জানেন, আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। শ্রেণিকক্ষের একটি ছেলে বা মেয়ে একদিন প্রশাসক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা, বিচারক কিংবা রাজনীতিক হতে পারে। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল একটি প্রজন্মকে শিক্ষিত করা নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির কাজ।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের কাছে তাই প্রত্যাশা থাকতে পারে- তিনি যেন শিক্ষা, মানবিকতা, নৈতিকতা ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে জাতীয় আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন।

আজকের তরুণরা শুধু চাকরি চায় না; তারা মর্যাদা চায়। তারা শুধু উন্নয়ন চায় না; তারা ন্যায়বিচার চায়। তারা শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ চায় না; তারা চায় যোগ্যতার মূল্যায়ন, নিরাপদ পরিবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তরুণদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা তাই আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত- এটি সাংবিধানিক বাস্তবতা। কিন্তু নৈতিক নেতৃত্বের শক্তি সব সময় সাংবিধানিক ক্ষমতার হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য, আচরণ, সংযম, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং জাতীয় সংকটে তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তৈরি করতে পারে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; তার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাতেও। জনগণ যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। আর প্রতিষ্ঠান যদি মানুষের আস্থা হারায়, তাহলে ব্যক্তি যত শক্তিশালীই হোন, রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।

এখানেও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা অনেকটা একজন শিক্ষকের মতো। শিক্ষক সব প্রশ্নের উত্তর নিজে দেন না; বরং শিক্ষার্থীকে এমনভাবে প্রস্তুত করেন, যাতে সে নিজেই উত্তর খুঁজে নিতে পারে। একইভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেশের প্রতিটি সমস্যার প্রশাসনিক সমাধান করা নয়। বরং সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বাংলাদেশের সামনে এখন অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মতো বহু চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হবে সংযম, প্রজ্ঞা, ভারসাম্য এবং আস্থা সৃষ্টির সক্ষমতা।

বিশেষ করে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে না দেখা, সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে না চিহ্নিত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সহিংসতার পরিবর্তে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করা- একটি পরিণত রাষ্ট্রের অন্যতম পূর্বশর্ত।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে তাই একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। তাঁর অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। বরং সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে দলীয় রাজনীতির বাইরে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।

২০ আগস্টের নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন একই দিন তাঁকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেটও প্রকাশ করেছে। এখন তাঁর সামনে ভোটের হিসাব নয়, ইতিহাসের হিসাব। আগামী দিনে তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা নির্ধারিত হবে তিনি রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব কতটা নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা ও মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে পারেন তার ওপর।

শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি- এই যাত্রা তাই শুধু একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়। এটি একটি প্রতীকের গল্পও। শ্রেণিকক্ষে একজন শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করেন; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন রাষ্ট্রপতি একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কৃতিতে আস্থার ভিত্তি শক্ত করতে পারেন।

সুতরাং আজকের প্রত্যাশা কেবল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে নয়; প্রত্যাশা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে, গণতন্ত্রকে ঘিরে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ঘিরে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে।

মির্জা ফখরুল যদি তাঁর শিক্ষকসুলভ ধৈর্য, যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও সংযমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে কাজে লাগাতে পারেন, তবে তাঁর নতুন অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অর্থবহ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

কারণ রাষ্ট্র কেবল আইন, ভবন, প্রশাসন কিংবা ক্ষমতার কাঠামোর নাম নয়। রাষ্ট্র হলো মানুষ, মানুষের অধিকার, মানুষের স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিষ্ঠান। আর মানুষ গড়ার প্রথম কারিগরদের অন্যতম হলেন শিক্ষক।

তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হওয়া আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রেখে যায়- যে মানুষ একদিন শ্রেণিকক্ষে মানুষ গড়ার পাঠ দিয়েছেন, তিনি কি এবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর শ্রেণিকক্ষে আস্থা, সহনশীলতা, ন্যায়, মানবিকতা ও সাংবিধানিক মর্যাদার পাঠ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন?

সময়ের বিচারেই মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর। তবে প্রত্যাশা থাকতেই পারে- শিক্ষকের হাতেই যেন থাকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের নৈতিক দিশা।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


প্রিন্ট