ঢাকা ০৪:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo প্রশাসনে বড় পরিবর্তন, চার মন্ত্রণালয়-বিভাগে নতুন সচিব Logo নবম পে-স্কেলের শেষ ধাপে সরকার: বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা Logo খাদ্যগুদামে নয়ছয়ের দিন শেষ, সিন্ডিকেটের মদদদাতারাও রেহাই পাবে না: খাদ্যমন্ত্রী Logo নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ৩৬০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০ Logo মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার্থ Logo মালয়েশিয়ায় অভিযানে ২৫২ জন আটক, ১৬৪ জনই বাংলাদেশি Logo রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় শপথ নিলেন মঈন খান, পার্থ, সাচিং ও শামীম Logo মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, আজই শপথের আভাস Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
কাগজে ঋণ নিয়মিত হলেই কি ব্যাংকের টাকা ফেরত আসে? নাকি পুনঃতফসিলের আড়ালে সংকট কেবল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়?

ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল: পুনর্বাসন, নাকি দায়মুক্তির পথ?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৬:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫৩৭ বার পড়া হয়েছে

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণকে আমরা প্রায়ই একটি হিসাবের সংখ্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি খেলাপি ঋণের পেছনে থাকে আমানতকারীর অর্থ, একজন উদ্যোক্তার ব্যর্থতা বা অনিয়ম, ব্যাংকারের সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব। খেলাপি ঋণ বাড়লে শুধু ব্যাংকের মুনাফা কমে না; ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমানতকারীর আস্থায়ও চাপ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই সংকট এখন আর ছোট কোনো সমস্যা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025 বলছে, ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশ।

এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- পুনঃতফসিল কি ঋণগ্রহীতাকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিচ্ছে, নাকি ব্যাংকিং খাতের সমস্যাকে কেবল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

পুনঃতফসিল প্রয়োজন, কিন্তু কার জন্য?

পুনঃতফসিল নিজেই কোনো খারাপ ব্যবস্থা নয়। ব্যবসা কখনো কখনো বাজারের মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সাময়িক নগদ সংকটে পড়ে। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা মৌলিকভাবে সক্ষম হলেও যদি সাময়িক সমস্যার কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাঁকে সময় দেওয়া অর্থনীতির স্বার্থেই যৌক্তিক।

এ ধরনের ঋণগ্রহীতাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া মানে একটি ব্যবসা, কিছু কর্মসংস্থান এবং একটি সম্ভাব্য উৎপাদনশীল সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখা।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রকৃত সংকটে পড়া উদ্যোক্তা আর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে পার্থক্য করা হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় অভ্যাসগত ঋণখেলাপি, জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ এবং অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। পুনঃতফসিলের আগে ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, অন্যান্য ব্যাংকে দায় এবং সামগ্রিক পরিশোধক্ষমতা যাচাই করার নির্দেশনাও রয়েছে।

অর্থাৎ নীতিগত কাঠামোতে মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত- ঋণগ্রহীতা সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন কি না।

কিন্তু বাস্তবে যদি এই যাচাই দুর্বল হয়, তাহলে পুনঃতফসিল হয়ে উঠতে পারে খেলাপি ঋণ লুকানোর একটি পদ্ধতি।

কাগজে নিয়মিত, বাস্তবে কি?

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিগুলোর একটি হলো- ঋণের শ্রেণি পরিবর্তনকে প্রকৃত আদায়ের সঙ্গে এক করে দেখা।

একটি ঋণ পুনঃতফসিল হলে তার হিসাবগত অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তাতে ব্যাংকের ভল্টে টাকা ফিরে আসে না। আমানতকারীর অর্থ ফেরত আসে না। ব্যাংকের তারল্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। বাস্তব পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হলো নগদ অর্থের প্রবাহ।

সুতরাং একটি ঋণ পুনঃতফসিল করার পর কত টাকা বাস্তবে আদায় হলো, কত কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ হলো, ব্যবসার উৎপাদন ও বিক্রি কতটা ঘুরে দাঁড়াল- এসব সূচক দিয়েই সফলতা মাপতে হবে। শুধু ‘খেলাপি থেকে নিয়মিত’- এই হিসাব দিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য বিচার করা বিপজ্জনক।

২০২৫ সালের পুনঃতফসিলের ঊর্ধ্বগতি কী বলছে?

২০২৪ সালের ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা থেকে এক বছরে পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়ে ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায় পৌঁছানো নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি ব্যাংকিং খাতে জমে থাকা ঋণসংকটের গভীরতারও একটি ইঙ্গিত।

এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এই ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা হলো ২০২৫ সালে নতুন করে পুনঃতফসিল করা ঋণ, মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি নয়।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়- যদি পুনঃতফসিলের পরিমাণ দ্রুত বাড়ে, অথচ খেলাপি ঋণও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে, তাহলে নীতিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।

পুনঃতফসিলের উদ্দেশ্য যদি হয় পুনরুদ্ধার, তবে তার ফলাফলও হতে হবে পুনরুদ্ধার।

ভালো ঋণগ্রহীতার প্রতি ন্যায্যতা কোথায়?

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আরেকটি নীরব সমস্যা তৈরি হয় যখন নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী এবং বারবার খেলাপি হওয়া ঋণগ্রহীতা প্রায় একই ধরনের সুবিধা পান।

একজন উদ্যোক্তা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করেন, সুদ দেন, ব্যাংকের সঙ্গে স্বচ্ছ সম্পর্ক বজায় রাখেন। অন্যদিকে আরেকজন বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও পুনঃতফসিল, সুদছাড় কিংবা নতুন সুবিধা পেয়ে যান- তাহলে প্রথমজনের কাছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বার্তাটি কী?

এতে moral hazard তৈরি হয়। মানুষ তখন ভাবতে পারেন- সময়মতো টাকা ফেরত দেওয়ার চেয়ে খেলাপি হওয়াই হয়তো বেশি লাভজনক।

অতএব পুনঃতফসিল নীতির সঙ্গে নিয়মিত ঋণগ্রহীতার জন্যও প্রণোদনা থাকা প্রয়োজন। ভালো ঋণগ্রহীতাকে শুধু ‘ভালো’ থাকার জন্য কোনো সুবিধা না দিলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়।

শুধু ঋণগ্রহীতার দায় নয়

ঋণখেলাপির আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায় সব সময় ঋণগ্রহীতার দিকে আঙুল তুলি। কিন্তু প্রতিটি বড় ঋণের অন্য পাশে একজন ব্যাংকারও ছিলেন।

ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকল্প যাচাই কে করেছেন? জামানতের মূল্যায়ন ঠিক ছিল কি? অর্থ কোথায় ব্যবহার হবে তা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল কি? একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি?

ঋণ দেওয়ার সময় যদি যথাযথ যাচাই না হয়, তাহলে পরে শুধু ঋণগ্রহীতাকে দায়ী করে ব্যাংকের দায় শেষ করা যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, Asset Quality Review এবং ব্যাংকভিত্তিক সম্পদের মান যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে শুধু ঋণগ্রহীতার নয়, ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংকের টাকা আসলে কার?

ব্যাংকের টাকা মূলত জনগণের আমানতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি হওয়া শুধু ব্যাংক মালিক বা পরিচালকদের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ আমানতকারী ও পুরো অর্থনীতির স্বার্থ।

একটি ব্যাংক যখন বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে অর্থ আটকে ফেলে, তখন তাকে অতিরিক্ত মূলধন, provision এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপ নিতে হয়। এর প্রভাব পড়ে নতুন ঋণ বিতরণেও।

অর্থাৎ খেলাপি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তা, ভোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ে।

পুনঃতফসিলের পাশাপাশি ‘এক্সিট’ কেন?

সব ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। কিছু ব্যবসা অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। বছরের পর বছর শুধু পুনঃতফসিল করে এমন প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখলে ব্যাংকের সম্পদ আরও ক্ষয় হতে পারে।

এই জায়গায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের Special Exit Policy for Recovery/Settlement of Loans গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নির্দিষ্ট শর্তে কিছু ঋণ এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়ে দীর্ঘদিনের আটকে থাকা অর্থ দ্রুত উদ্ধারের পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত- ঋণকে অনন্তকাল ধরে টেনে নেওয়া নয়; বরং যেখানে পুনরুদ্ধার সম্ভব, সেখানে পুনর্বাসন এবং যেখানে ব্যবসা আর টেকসই নয়, সেখানে দ্রুত নিষ্পত্তি।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিংই মূল শর্ত

বাংলাদেশের ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ভাঙতে হলে সবচেয়ে কঠিন জায়গাটিতে হাত দিতে হবে- ব্যাংকিং সুশাসন।

কারও রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক প্রভাব, মালিকানা-সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা না দেয়। একইভাবে ঋণখেলাপির পরও যেন প্রভাবের কারণে বারবার সুযোগ না মেলে।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা- সবার সিদ্ধান্তে যদি পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বদলানো সম্ভব।

তাহলে সমাধান কী?

সমাধান কোনো একক নীতিতে নেই। প্রয়োজন কয়েকটি ব্যবস্থার সমন্বয়।

প্রথমত, সত্যিকার অর্থে সাময়িক সংকটে থাকা ও সম্ভাবনাময় ব্যবসার জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ও অভ্যাসগত খেলাপি, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, পুনঃতফসিলের পর প্রতিটি ঋণের জন্য বাস্তবসম্মত Recovery Plan থাকতে হবে।

চতুর্থত, ঋণের অর্থ কোথায় গেছে, ব্যবসা চলছে কি না, সম্পদ কোথায় আছে- এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

পঞ্চমত, ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে ব্যাংকারদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

ষষ্ঠত, ভালো ঋণগ্রহীতার জন্য প্রণোদনা এবং নিয়মিত পরিশোধকারীদের প্রতি দৃশ্যমান ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, পুনঃতফসিলকে যেন নিয়মিত ঋণখেলাপির বিকল্প পথ বানানো না হয়।

পুনর্বাসন হোক, দায়মুক্তি নয়

ঋণখেলাপি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ব্যবসা বাঁচানোর সুযোগ অবশ্যই দিতে হবে। কারণ একটি ভালো ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একজন উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না; কর্মসংস্থান কমে, উৎপাদন কমে এবং অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু পুনর্বাসন আর দায়মুক্তি এক জিনিস নয়।

যে উদ্যোক্তা সাময়িক সংকটে পড়েছেন, তাঁকে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক। কিন্তু যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না, সম্পদ সরিয়ে ফেলেন কিংবা ব্যাংকের অর্থ অন্যত্র ব্যবহার করেন, তাঁর জন্য একই নীতি প্রয়োগ করা অন্যায়- ভালো ঋণগ্রহীতার প্রতিও, আমানতকারীর প্রতিও এবং রাষ্ট্রের প্রতিও।

তাই পুনঃতফসিলের সাফল্য কাগজে কত ঋণ ‘নিয়মিত’ হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে- কত টাকা বাস্তবে উদ্ধার হলো, কতটি ব্যবসা টিকে গেল, কত কর্মসংস্থান রক্ষা হলো এবং কতটা কমল ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সাময়িক স্বস্তির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা বেশি জরুরি।

পুনঃতফসিল দরকার- কিন্তু তা যেন পুনর্বাসনের সেতু হয়, দায়মুক্তির দরজা নয়।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

কাগজে ঋণ নিয়মিত হলেই কি ব্যাংকের টাকা ফেরত আসে? নাকি পুনঃতফসিলের আড়ালে সংকট কেবল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়?

ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল: পুনর্বাসন, নাকি দায়মুক্তির পথ?

আপডেট সময় ০৬:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণকে আমরা প্রায়ই একটি হিসাবের সংখ্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি খেলাপি ঋণের পেছনে থাকে আমানতকারীর অর্থ, একজন উদ্যোক্তার ব্যর্থতা বা অনিয়ম, ব্যাংকারের সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব। খেলাপি ঋণ বাড়লে শুধু ব্যাংকের মুনাফা কমে না; ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আমানতকারীর আস্থায়ও চাপ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এই সংকট এখন আর ছোট কোনো সমস্যা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের Financial Stability Report 2025 বলছে, ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৯৯ শতাংশ।

এই দুটি তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- পুনঃতফসিল কি ঋণগ্রহীতাকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দিচ্ছে, নাকি ব্যাংকিং খাতের সমস্যাকে কেবল ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?

পুনঃতফসিল প্রয়োজন, কিন্তু কার জন্য?

পুনঃতফসিল নিজেই কোনো খারাপ ব্যবস্থা নয়। ব্যবসা কখনো কখনো বাজারের মন্দা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সাময়িক নগদ সংকটে পড়ে। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা মৌলিকভাবে সক্ষম হলেও যদি সাময়িক সমস্যার কারণে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন, তাঁকে সময় দেওয়া অর্থনীতির স্বার্থেই যৌক্তিক।

এ ধরনের ঋণগ্রহীতাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া মানে একটি ব্যবসা, কিছু কর্মসংস্থান এবং একটি সম্ভাব্য উৎপাদনশীল সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখা।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন প্রকৃত সংকটে পড়া উদ্যোক্তা আর ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে পার্থক্য করা হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় অভ্যাসগত ঋণখেলাপি, জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ এবং অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনায় পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। পুনঃতফসিলের আগে ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, অন্যান্য ব্যাংকে দায় এবং সামগ্রিক পরিশোধক্ষমতা যাচাই করার নির্দেশনাও রয়েছে।

অর্থাৎ নীতিগত কাঠামোতে মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত- ঋণগ্রহীতা সত্যিই ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন কি না।

কিন্তু বাস্তবে যদি এই যাচাই দুর্বল হয়, তাহলে পুনঃতফসিল হয়ে উঠতে পারে খেলাপি ঋণ লুকানোর একটি পদ্ধতি।

কাগজে নিয়মিত, বাস্তবে কি?

ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিগুলোর একটি হলো- ঋণের শ্রেণি পরিবর্তনকে প্রকৃত আদায়ের সঙ্গে এক করে দেখা।

একটি ঋণ পুনঃতফসিল হলে তার হিসাবগত অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু তাতে ব্যাংকের ভল্টে টাকা ফিরে আসে না। আমানতকারীর অর্থ ফেরত আসে না। ব্যাংকের তারল্যও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। বাস্তব পুনরুদ্ধারের প্রমাণ হলো নগদ অর্থের প্রবাহ।

সুতরাং একটি ঋণ পুনঃতফসিল করার পর কত টাকা বাস্তবে আদায় হলো, কত কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ হলো, ব্যবসার উৎপাদন ও বিক্রি কতটা ঘুরে দাঁড়াল- এসব সূচক দিয়েই সফলতা মাপতে হবে। শুধু ‘খেলাপি থেকে নিয়মিত’- এই হিসাব দিয়ে ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য বিচার করা বিপজ্জনক।

২০২৫ সালের পুনঃতফসিলের ঊর্ধ্বগতি কী বলছে?

২০২৪ সালের ৮৫ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা থেকে এক বছরে পুনঃতফসিলের পরিমাণ বেড়ে ২০২৫ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায় পৌঁছানো নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি ব্যাংকিং খাতে জমে থাকা ঋণসংকটের গভীরতারও একটি ইঙ্গিত।

এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। এই ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা হলো ২০২৫ সালে নতুন করে পুনঃতফসিল করা ঋণ, মোট পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি নয়।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায়- যদি পুনঃতফসিলের পরিমাণ দ্রুত বাড়ে, অথচ খেলাপি ঋণও নতুন উচ্চতায় পৌঁছে, তাহলে নীতিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়।

পুনঃতফসিলের উদ্দেশ্য যদি হয় পুনরুদ্ধার, তবে তার ফলাফলও হতে হবে পুনরুদ্ধার।

ভালো ঋণগ্রহীতার প্রতি ন্যায্যতা কোথায়?

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আরেকটি নীরব সমস্যা তৈরি হয় যখন নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী এবং বারবার খেলাপি হওয়া ঋণগ্রহীতা প্রায় একই ধরনের সুবিধা পান।

একজন উদ্যোক্তা সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করেন, সুদ দেন, ব্যাংকের সঙ্গে স্বচ্ছ সম্পর্ক বজায় রাখেন। অন্যদিকে আরেকজন বছরের পর বছর ঋণ পরিশোধ না করেও পুনঃতফসিল, সুদছাড় কিংবা নতুন সুবিধা পেয়ে যান- তাহলে প্রথমজনের কাছে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বার্তাটি কী?

এতে moral hazard তৈরি হয়। মানুষ তখন ভাবতে পারেন- সময়মতো টাকা ফেরত দেওয়ার চেয়ে খেলাপি হওয়াই হয়তো বেশি লাভজনক।

অতএব পুনঃতফসিল নীতির সঙ্গে নিয়মিত ঋণগ্রহীতার জন্যও প্রণোদনা থাকা প্রয়োজন। ভালো ঋণগ্রহীতাকে শুধু ‘ভালো’ থাকার জন্য কোনো সুবিধা না দিলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা দুর্বল হয়।

শুধু ঋণগ্রহীতার দায় নয়

ঋণখেলাপির আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায় সব সময় ঋণগ্রহীতার দিকে আঙুল তুলি। কিন্তু প্রতিটি বড় ঋণের অন্য পাশে একজন ব্যাংকারও ছিলেন।

ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকল্প যাচাই কে করেছেন? জামানতের মূল্যায়ন ঠিক ছিল কি? অর্থ কোথায় ব্যবহার হবে তা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল কি? একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি?

ঋণ দেওয়ার সময় যদি যথাযথ যাচাই না হয়, তাহলে পরে শুধু ঋণগ্রহীতাকে দায়ী করে ব্যাংকের দায় শেষ করা যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, Asset Quality Review এবং ব্যাংকভিত্তিক সম্পদের মান যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে শুধু ঋণগ্রহীতার নয়, ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যাংকের টাকা আসলে কার?

ব্যাংকের টাকা মূলত জনগণের আমানতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি হওয়া শুধু ব্যাংক মালিক বা পরিচালকদের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাধারণ আমানতকারী ও পুরো অর্থনীতির স্বার্থ।

একটি ব্যাংক যখন বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে অর্থ আটকে ফেলে, তখন তাকে অতিরিক্ত মূলধন, provision এবং তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপ নিতে হয়। এর প্রভাব পড়ে নতুন ঋণ বিতরণেও।

অর্থাৎ খেলাপি ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তা, ভোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের ওপরও পড়ে।

পুনঃতফসিলের পাশাপাশি ‘এক্সিট’ কেন?

সব ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। কিছু ব্যবসা অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে যায়। বছরের পর বছর শুধু পুনঃতফসিল করে এমন প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখলে ব্যাংকের সম্পদ আরও ক্ষয় হতে পারে।

এই জায়গায় ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের Special Exit Policy for Recovery/Settlement of Loans গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নির্দিষ্ট শর্তে কিছু ঋণ এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়ে দীর্ঘদিনের আটকে থাকা অর্থ দ্রুত উদ্ধারের পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত- ঋণকে অনন্তকাল ধরে টেনে নেওয়া নয়; বরং যেখানে পুনরুদ্ধার সম্ভব, সেখানে পুনর্বাসন এবং যেখানে ব্যবসা আর টেকসই নয়, সেখানে দ্রুত নিষ্পত্তি।

রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিংই মূল শর্ত

বাংলাদেশের ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ভাঙতে হলে সবচেয়ে কঠিন জায়গাটিতে হাত দিতে হবে- ব্যাংকিং সুশাসন।

কারও রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক প্রভাব, মালিকানা-সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা না দেয়। একইভাবে ঋণখেলাপির পরও যেন প্রভাবের কারণে বারবার সুযোগ না মেলে।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা- সবার সিদ্ধান্তে যদি পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বদলানো সম্ভব।

তাহলে সমাধান কী?

সমাধান কোনো একক নীতিতে নেই। প্রয়োজন কয়েকটি ব্যবস্থার সমন্বয়।

প্রথমত, সত্যিকার অর্থে সাময়িক সংকটে থাকা ও সম্ভাবনাময় ব্যবসার জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত ও অভ্যাসগত খেলাপি, জালিয়াতি এবং অর্থপাচারের সঙ্গে যুক্ত ঋণের ক্ষেত্রে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, পুনঃতফসিলের পর প্রতিটি ঋণের জন্য বাস্তবসম্মত Recovery Plan থাকতে হবে।

চতুর্থত, ঋণের অর্থ কোথায় গেছে, ব্যবসা চলছে কি না, সম্পদ কোথায় আছে- এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

পঞ্চমত, ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হলে ব্যাংকারদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

ষষ্ঠত, ভালো ঋণগ্রহীতার জন্য প্রণোদনা এবং নিয়মিত পরিশোধকারীদের প্রতি দৃশ্যমান ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, পুনঃতফসিলকে যেন নিয়মিত ঋণখেলাপির বিকল্প পথ বানানো না হয়।

পুনর্বাসন হোক, দায়মুক্তি নয়

ঋণখেলাপি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ব্যবসা বাঁচানোর সুযোগ অবশ্যই দিতে হবে। কারণ একটি ভালো ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একজন উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না; কর্মসংস্থান কমে, উৎপাদন কমে এবং অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু পুনর্বাসন আর দায়মুক্তি এক জিনিস নয়।

যে উদ্যোক্তা সাময়িক সংকটে পড়েছেন, তাঁকে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক। কিন্তু যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দেন না, সম্পদ সরিয়ে ফেলেন কিংবা ব্যাংকের অর্থ অন্যত্র ব্যবহার করেন, তাঁর জন্য একই নীতি প্রয়োগ করা অন্যায়- ভালো ঋণগ্রহীতার প্রতিও, আমানতকারীর প্রতিও এবং রাষ্ট্রের প্রতিও।

তাই পুনঃতফসিলের সাফল্য কাগজে কত ঋণ ‘নিয়মিত’ হলো, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। মাপতে হবে- কত টাকা বাস্তবে উদ্ধার হলো, কতটি ব্যবসা টিকে গেল, কত কর্মসংস্থান রক্ষা হলো এবং কতটা কমল ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংস্কৃতি।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সাময়িক স্বস্তির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলা বেশি জরুরি।

পুনঃতফসিল দরকার- কিন্তু তা যেন পুনর্বাসনের সেতু হয়, দায়মুক্তির দরজা নয়।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট