ঢাকা ০৪:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo প্রশাসনে বড় পরিবর্তন, চার মন্ত্রণালয়-বিভাগে নতুন সচিব Logo নবম পে-স্কেলের শেষ ধাপে সরকার: বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা Logo খাদ্যগুদামে নয়ছয়ের দিন শেষ, সিন্ডিকেটের মদদদাতারাও রেহাই পাবে না: খাদ্যমন্ত্রী Logo নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ৩৬০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০ Logo মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার্থ Logo মালয়েশিয়ায় অভিযানে ২৫২ জন আটক, ১৬৪ জনই বাংলাদেশি Logo রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় শপথ নিলেন মঈন খান, পার্থ, সাচিং ও শামীম Logo মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, আজই শপথের আভাস Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

হাসিনা বললেন সেলিম, কাদের বললেন নতুন প্রজন্ম- আওয়ামী লীগ যাবে কোন পথে?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৩:৫৯:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫২৫ বার পড়া হয়েছে

রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বাক্যই একটি দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর সেই বাক্য যদি আসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি দলের শীর্ষ সারির নেতার কাছ থেকে, তখন তার রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি বক্তব্য- “New times need new men and new ideas. We should pass the baton to a new generation”- বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমনই একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অর্থাৎ, নতুন সময়ের জন্য নতুন মানুষ ও নতুন চিন্তা প্রয়োজন; দায়িত্ব তুলে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের হাতে।

কথাটি শুনতে সাধারণ রাজনৈতিক উপলব্ধি মনে হতে পারে। কিন্তু বক্তা ওবায়দুল কাদের। আর সময়টিও সাধারণ নয়।

আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। এর মধ্যেই শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে দলীয় নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম উল্লেখ করেছেন।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- হাসিনা বললেন সেলিম, কাদের বললেন নতুন প্রজন্ম- আওয়ামী লীগ যাবে কোন পথে?

শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার প্রশ্ন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ হাসিনার অবস্থান অনস্বীকার্য। ১৯৮১ সালে দলের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাস্তবতা বদলে গেছে। শেখ হাসিনা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমও কঠিন সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন- প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিকভাবে এর একটি তাৎপর্য হতে পারে- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি এখনো প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা- নতুন মানুষ, নতুন চিন্তা, নতুন প্রজন্ম।

দুটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন উঠবেই: আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কি পুরোনো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায়, নাকি প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে?

কাদেরের বক্তব্য কি ‘মাইনাস হাসিনা’?

সরাসরি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই যুক্তিসংগত নয়।

‘নতুন প্রজন্ম’ বললেই শেখ হাসিনাকে বাদ দেওয়ার কথা বোঝায় না। কাদের তাঁর বক্তব্যে শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর নেতৃত্বের সরাসরি সমালোচনাও করেননি।

সুতরাং একটি বাক্যকে ‘মাইনাস হাসিনা’ ফর্মুলা হিসেবে ঘোষণা করা রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের অর্থ শুধু শব্দে থাকে না; সময়, প্রেক্ষাপট ও বক্তার রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

ওবায়দুল কাদের দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের নীতির পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।

তাই তাঁর মুখে এখন যদি নতুন প্রজন্মের হাতে ‘ব্যাটন’ তুলে দেওয়ার কথা আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- তিনি কি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে নতুনভাবে ভাবছেন?

পুরোনো নেতৃত্বের দায় কোথায়?

এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি। নতুন নেতৃত্বের কথা বলা সহজ। কিন্তু পুরোনো নেতৃত্বের দায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনগণের একাংশের ক্ষোভ- এসব নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

এসবের রাজনৈতিক দায় শুধু একজন ব্যক্তির নয়; দলীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরই প্রশ্ন উঠেছে।

ওবায়দুল কাদেরও সেই নেতৃত্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাই এখন যদি বলা হয়, ‘নতুন মানুষ চাই’, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবেই- পুরোনো সময়ের ভুলের দায় কে নেবে?

নতুন প্রজন্ম কি শুধু নতুন মুখ হিসেবে সামনে আসবে, নাকি তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও সমালোচনা করবে?

একজন তরুণ নেতাকে সামনে এনে যদি পুরোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও দলীয় সংস্কৃতিই বহাল থাকে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত পরিবর্তন বলা কঠিন।

আওয়ামী লীগের সংকট শুধু নেতা পরিবর্তনের নয়

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে শুধু নেতৃত্বের সংকট হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নিবন্ধন স্থগিত, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক- সব মিলিয়ে দলটি অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতির মুখোমুখি। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু- কে নেতা হবেন?

আরও বড় প্রশ্ন হলো- দলটি কীভাবে আবার বৈধ ও কার্যকর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরবে? কীভাবে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে? এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে?

অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের সামনে নেতৃত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক পুনর্বাসন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনআস্থা পুনর্নির্মাণের প্রশ্ন।

শেখ সেলিমের নেতৃত্ব বনাম নতুন প্রজন্ম

শেখ হাসিনা যে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের কথা বলেছেন, সেটিকে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব কাঠামোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। শেখ সেলিম দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের জ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি শেখ পরিবারেরও সদস্য।

অন্যদিকে ‘নতুন প্রজন্মের হাতে ব্যাটন’ কথাটি সামনে আনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক ধারণা- প্রজন্মগত নেতৃত্বের পরিবর্তন। এখানে আওয়ামী লীগের সামনে অন্তত দুটি মডেল দেখা যায়।

প্রথমত, ধারাবাহিকতার মডেল- পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামো থাকবে, জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব নেতৃত্ব দেবে এবং ধীরে ধীরে নতুন মুখ যুক্ত হবে।

দ্বিতীয়ত, পুনর্গঠনের মডেল- পুরোনো কাঠামোর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নতুন নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক ভাষা এবং নতুন সাংগঠনিক সংস্কৃতি তৈরি করা হবে।

আওয়ামী লীগ কোন পথ বেছে নেয়, সেটিই ভবিষ্যতে দলটির চরিত্র নির্ধারণ করতে পারে।

কাদের কি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জায়গা তৈরি করছেন?

এ প্রশ্নটিও অপ্রাসঙ্গিক নয়। ওবায়দুল কাদের নিজেই আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অংশ। তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাই ‘নতুন প্রজন্মের হাতে ব্যাটন’ দেওয়ার ধারণাটি যদি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে- সেই নতুন কাঠামোয় তাঁর নিজের ভূমিকা কী?

আসল লড়াই কি ‘হাসিনা বনাম কাদের’?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার প্রবণতা প্রবল। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে- এটি কি হাসিনা বনাম কাদেরের নতুন কোনো দ্বন্দ্ব?

আমার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- পুরোনো আওয়ামী লীগ বনাম নতুন আওয়ামী লীগ।

কারণ শেখ হাসিনা থাকবেন কি থাকবেন না- এটি নেতৃত্বের প্রশ্ন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে কী ধরনের দল হবে- এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।

একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর বড় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়লে তাকে শুধু নেতা পরিবর্তন করলেই হয় না; তাকে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কও পুনর্বিবেচনা করতে হয়।

সেই জায়গা থেকেই ‘নতুন মানুষ ও নতুন চিন্তা’র প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নতুন মুখ এলেই কি নতুন আওয়ামী লীগ হবে?

এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে ‘তরুণ’ শব্দটিকে ‘নতুন’ শব্দের সমার্থক মনে করা। তরুণ নেতা মানেই নতুন রাজনীতি নয়। নতুন রাজনীতি মানে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সম্পর্ক।

এসব পরিবর্তন ছাড়া ৫০ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গায় ৩০ বছরের তরুণ নেতাকে বসালেও মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে না। সেটি হবে মুখ বদল, চরিত্র বদল নয়।

আওয়ামী লীগের সামনে তিন পথ

বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে অন্তত তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যায়।

প্রথমত, শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক ধারাবাহিকতা। দল তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রবীণ নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনর্গঠন। শেখ সেলিমসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা সাংগঠনিক নেতৃত্বে থেকে দলকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে পুনর্জন্ম। পুরোনো নেতৃত্বের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন প্রজন্মকে সামনে এনে দলীয় রাজনীতির নতুন কাঠামো তৈরি করা হতে পারে।

তৃতীয় পথটিই সবচেয়ে কঠিন। কারণ নতুন প্রজন্মকে শুধু নেতৃত্ব নিতে হবে না; জনগণকে বোঝাতে হবে- তারা কেন অতীতের আওয়ামী লীগের চেয়ে আলাদা।

‘মাইনাস হাসিনা’ নয়, ‘মাইনাস পুরোনো সংস্কৃতি’- এটাই পরীক্ষা

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় সম্ভবত এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিলেই আওয়ামী লীগ নতুন হবে না। শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দিলেই দল নতুন হবে না। আবার ওবায়দুল কাদেরের মতো পুরোনো নেতার মুখে নতুন প্রজন্মের কথা এলেই পরিবর্তন নিশ্চিত হবে না।

পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন আওয়ামী লীগ নিজের রাজনৈতিক অতীতের দিকে তাকিয়ে আত্মসমালোচনার সাহস দেখাবে।

কোথায় ভুল হয়েছিল? কেন জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল? কেন বিরোধী মতকে জায়গা দেওয়া হয়নি? কেন দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল? ভবিষ্যতে কীভাবে এসবের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ‘নতুন প্রজন্ম’ কেবল একটি আকর্ষণীয় রাজনৈতিক স্লোগান হয়েই থাকবে।

শেষ প্রশ্নটি তাই অন্য জায়গায়

ওবায়দুল কাদের কি শেখ হাসিনাকে ‘মাইনাস’ করার বার্তা দিয়েছেন?

এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। হাসিনা ও কাদেরের মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক ফাটল তৈরি হয়েছে- এমন দাবিও নিশ্চিতভাবে করা যায় না।

তবে তাঁদের বক্তব্য দুটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।

একদিকে শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমের নেতৃত্বের কথা বলছেন। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের বলছেন- নতুন সময়ের জন্য নতুন মানুষ ও নতুন চিন্তা দরকার; দায়িত্ব তুলে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের হাতে।

এই দুই অবস্থানের মধ্যেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান- ধারাবাহিকতা, নাকি পুনর্গঠন? পুরোনো নেতৃত্ব, নাকি নতুন প্রজন্ম? ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব?

শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কোন পথ বেছে নেবে, সেটি শুধু দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকাও অনেকাংশে তার ওপর নির্ভর করবে।

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত ‘মাইনাস হাসিনা’ নয়।

প্রশ্নটি আরও বড়- আওয়ামী লীগ কি শুধু নেতৃত্ব বদলাবে, নাকি নিজেকেই বদলাবে?

কারণ নতুন মুখ দিয়ে পুরোনো রাজনীতি ফিরিয়ে আনা হলে সেটি পরিবর্তন নয়- শুধু পুনঃব্র্যান্ডিং।

আর সত্যিকার অর্থে নতুন প্রজন্মের হাতে যদি ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যাটনের সঙ্গে শুধু নেতৃত্বের ক্ষমতা নয়- অতীতের দায়, আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি এবং নতুন রাজনৈতিক অঙ্গীকারও তুলে দিতে হবে।

সেখানেই নির্ধারিত হবে আওয়ামী লীগ কোন পথে যাবে- সেলিমের ধারাবাহিকতায়, নাকি কাদেরের কথিত ‘নতুন প্রজন্মের’ পথে।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

হাসিনা বললেন সেলিম, কাদের বললেন নতুন প্রজন্ম- আওয়ামী লীগ যাবে কোন পথে?

আপডেট সময় ০৩:৫৯:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বাক্যই একটি দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর সেই বাক্য যদি আসে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি দলের শীর্ষ সারির নেতার কাছ থেকে, তখন তার রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি বক্তব্য- “New times need new men and new ideas. We should pass the baton to a new generation”- বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমনই একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অর্থাৎ, নতুন সময়ের জন্য নতুন মানুষ ও নতুন চিন্তা প্রয়োজন; দায়িত্ব তুলে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের হাতে।

কথাটি শুনতে সাধারণ রাজনৈতিক উপলব্ধি মনে হতে পারে। কিন্তু বক্তা ওবায়দুল কাদের। আর সময়টিও সাধারণ নয়।

আওয়ামী লীগ এখন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। এর মধ্যেই শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে দলীয় নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাম উল্লেখ করেছেন।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- হাসিনা বললেন সেলিম, কাদের বললেন নতুন প্রজন্ম- আওয়ামী লীগ যাবে কোন পথে?

শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার প্রশ্ন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রশ্নে শেখ হাসিনার অবস্থান অনস্বীকার্য। ১৯৮১ সালে দলের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দীর্ঘ সময় তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাস্তবতা বদলে গেছে। শেখ হাসিনা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমও কঠিন সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন- প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিকভাবে এর একটি তাৎপর্য হতে পারে- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি এখনো প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

অন্যদিকে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা- নতুন মানুষ, নতুন চিন্তা, নতুন প্রজন্ম।

দুটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন উঠবেই: আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কি পুরোনো নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায়, নাকি প্রজন্মগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে?

কাদেরের বক্তব্য কি ‘মাইনাস হাসিনা’?

সরাসরি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই যুক্তিসংগত নয়।

‘নতুন প্রজন্ম’ বললেই শেখ হাসিনাকে বাদ দেওয়ার কথা বোঝায় না। কাদের তাঁর বক্তব্যে শেখ হাসিনার নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর নেতৃত্বের সরাসরি সমালোচনাও করেননি।

সুতরাং একটি বাক্যকে ‘মাইনাস হাসিনা’ ফর্মুলা হিসেবে ঘোষণা করা রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে।

তবে রাজনৈতিক বক্তব্যের অর্থ শুধু শব্দে থাকে না; সময়, প্রেক্ষাপট ও বক্তার রাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

ওবায়দুল কাদের দীর্ঘ সময় শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের নীতির পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।

তাই তাঁর মুখে এখন যদি নতুন প্রজন্মের হাতে ‘ব্যাটন’ তুলে দেওয়ার কথা আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- তিনি কি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে নতুনভাবে ভাবছেন?

পুরোনো নেতৃত্বের দায় কোথায়?

এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি। নতুন নেতৃত্বের কথা বলা সহজ। কিন্তু পুরোনো নেতৃত্বের দায়ের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনগণের একাংশের ক্ষোভ- এসব নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

এসবের রাজনৈতিক দায় শুধু একজন ব্যক্তির নয়; দলীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত পুরো রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরই প্রশ্ন উঠেছে।

ওবায়দুল কাদেরও সেই নেতৃত্ব কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তাই এখন যদি বলা হয়, ‘নতুন মানুষ চাই’, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবেই- পুরোনো সময়ের ভুলের দায় কে নেবে?

নতুন প্রজন্ম কি শুধু নতুন মুখ হিসেবে সামনে আসবে, নাকি তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও সমালোচনা করবে?

একজন তরুণ নেতাকে সামনে এনে যদি পুরোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও দলীয় সংস্কৃতিই বহাল থাকে, তাহলে সেটিকে প্রকৃত পরিবর্তন বলা কঠিন।

আওয়ামী লীগের সংকট শুধু নেতা পরিবর্তনের নয়

আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটকে শুধু নেতৃত্বের সংকট হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নিবন্ধন স্থগিত, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, নেতৃত্বের অনুপস্থিতি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক- সব মিলিয়ে দলটি অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতির মুখোমুখি। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন প্রশ্ন শুধু- কে নেতা হবেন?

আরও বড় প্রশ্ন হলো- দলটি কীভাবে আবার বৈধ ও কার্যকর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরবে? কীভাবে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে? এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে?

অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের সামনে নেতৃত্বের প্রশ্নের পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক পুনর্বাসন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনআস্থা পুনর্নির্মাণের প্রশ্ন।

শেখ সেলিমের নেতৃত্ব বনাম নতুন প্রজন্ম

শেখ হাসিনা যে শেখ ফজলুল করিম সেলিমের কথা বলেছেন, সেটিকে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত নেতৃত্ব কাঠামোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যেতে পারে। শেখ সেলিম দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নেতা এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের জ্যেষ্ঠ সদস্য। তিনি শেখ পরিবারেরও সদস্য।

অন্যদিকে ‘নতুন প্রজন্মের হাতে ব্যাটন’ কথাটি সামনে আনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক ধারণা- প্রজন্মগত নেতৃত্বের পরিবর্তন। এখানে আওয়ামী লীগের সামনে অন্তত দুটি মডেল দেখা যায়।

প্রথমত, ধারাবাহিকতার মডেল- পুরোনো সাংগঠনিক কাঠামো থাকবে, জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব নেতৃত্ব দেবে এবং ধীরে ধীরে নতুন মুখ যুক্ত হবে।

দ্বিতীয়ত, পুনর্গঠনের মডেল- পুরোনো কাঠামোর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নতুন নেতৃত্ব, নতুন রাজনৈতিক ভাষা এবং নতুন সাংগঠনিক সংস্কৃতি তৈরি করা হবে।

আওয়ামী লীগ কোন পথ বেছে নেয়, সেটিই ভবিষ্যতে দলটির চরিত্র নির্ধারণ করতে পারে।

কাদের কি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জায়গা তৈরি করছেন?

এ প্রশ্নটিও অপ্রাসঙ্গিক নয়। ওবায়দুল কাদের নিজেই আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অংশ। তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাই ‘নতুন প্রজন্মের হাতে ব্যাটন’ দেওয়ার ধারণাটি যদি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে- সেই নতুন কাঠামোয় তাঁর নিজের ভূমিকা কী?

আসল লড়াই কি ‘হাসিনা বনাম কাদের’?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার প্রবণতা প্রবল। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে- এটি কি হাসিনা বনাম কাদেরের নতুন কোনো দ্বন্দ্ব?

আমার দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- পুরোনো আওয়ামী লীগ বনাম নতুন আওয়ামী লীগ।

কারণ শেখ হাসিনা থাকবেন কি থাকবেন না- এটি নেতৃত্বের প্রশ্ন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে কী ধরনের দল হবে- এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।

একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পর বড় রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়লে তাকে শুধু নেতা পরিবর্তন করলেই হয় না; তাকে নিজের রাজনৈতিক দর্শন, সাংগঠনিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্কও পুনর্বিবেচনা করতে হয়।

সেই জায়গা থেকেই ‘নতুন মানুষ ও নতুন চিন্তা’র প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নতুন মুখ এলেই কি নতুন আওয়ামী লীগ হবে?

এখানে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে ‘তরুণ’ শব্দটিকে ‘নতুন’ শব্দের সমার্থক মনে করা। তরুণ নেতা মানেই নতুন রাজনীতি নয়। নতুন রাজনীতি মানে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সম্পর্ক।

এসব পরিবর্তন ছাড়া ৫০ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গায় ৩০ বছরের তরুণ নেতাকে বসালেও মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে না। সেটি হবে মুখ বদল, চরিত্র বদল নয়।

আওয়ামী লীগের সামনে তিন পথ

বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে অন্তত তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যায়।

প্রথমত, শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক ধারাবাহিকতা। দল তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, প্রবীণ নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনর্গঠন। শেখ সেলিমসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা সাংগঠনিক নেতৃত্বে থেকে দলকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।

তৃতীয়ত, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে পুনর্জন্ম। পুরোনো নেতৃত্বের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন প্রজন্মকে সামনে এনে দলীয় রাজনীতির নতুন কাঠামো তৈরি করা হতে পারে।

তৃতীয় পথটিই সবচেয়ে কঠিন। কারণ নতুন প্রজন্মকে শুধু নেতৃত্ব নিতে হবে না; জনগণকে বোঝাতে হবে- তারা কেন অতীতের আওয়ামী লীগের চেয়ে আলাদা।

‘মাইনাস হাসিনা’ নয়, ‘মাইনাস পুরোনো সংস্কৃতি’- এটাই পরীক্ষা

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় সম্ভবত এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে দিলেই আওয়ামী লীগ নতুন হবে না। শেখ সেলিমকে দায়িত্ব দিলেই দল নতুন হবে না। আবার ওবায়দুল কাদেরের মতো পুরোনো নেতার মুখে নতুন প্রজন্মের কথা এলেই পরিবর্তন নিশ্চিত হবে না।

পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হবে, যখন আওয়ামী লীগ নিজের রাজনৈতিক অতীতের দিকে তাকিয়ে আত্মসমালোচনার সাহস দেখাবে।

কোথায় ভুল হয়েছিল? কেন জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল? কেন বিরোধী মতকে জায়গা দেওয়া হয়নি? কেন দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল? ভবিষ্যতে কীভাবে এসবের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ‘নতুন প্রজন্ম’ কেবল একটি আকর্ষণীয় রাজনৈতিক স্লোগান হয়েই থাকবে।

শেষ প্রশ্নটি তাই অন্য জায়গায়

ওবায়দুল কাদের কি শেখ হাসিনাকে ‘মাইনাস’ করার বার্তা দিয়েছেন?

এখনই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। হাসিনা ও কাদেরের মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক ফাটল তৈরি হয়েছে- এমন দাবিও নিশ্চিতভাবে করা যায় না।

তবে তাঁদের বক্তব্য দুটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।

একদিকে শেখ হাসিনা তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ সেলিমের নেতৃত্বের কথা বলছেন। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের বলছেন- নতুন সময়ের জন্য নতুন মানুষ ও নতুন চিন্তা দরকার; দায়িত্ব তুলে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের হাতে।

এই দুই অবস্থানের মধ্যেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান- ধারাবাহিকতা, নাকি পুনর্গঠন? পুরোনো নেতৃত্ব, নাকি নতুন প্রজন্ম? ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব?

শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কোন পথ বেছে নেবে, সেটি শুধু দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকাও অনেকাংশে তার ওপর নির্ভর করবে।

তাই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত ‘মাইনাস হাসিনা’ নয়।

প্রশ্নটি আরও বড়- আওয়ামী লীগ কি শুধু নেতৃত্ব বদলাবে, নাকি নিজেকেই বদলাবে?

কারণ নতুন মুখ দিয়ে পুরোনো রাজনীতি ফিরিয়ে আনা হলে সেটি পরিবর্তন নয়- শুধু পুনঃব্র্যান্ডিং।

আর সত্যিকার অর্থে নতুন প্রজন্মের হাতে যদি ব্যাটন তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যাটনের সঙ্গে শুধু নেতৃত্বের ক্ষমতা নয়- অতীতের দায়, আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি এবং নতুন রাজনৈতিক অঙ্গীকারও তুলে দিতে হবে।

সেখানেই নির্ধারিত হবে আওয়ামী লীগ কোন পথে যাবে- সেলিমের ধারাবাহিকতায়, নাকি কাদেরের কথিত ‘নতুন প্রজন্মের’ পথে।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


প্রিন্ট