এক বছর পরও সুরে অমর ফরিদা পারভীন : আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী
- আপডেট সময় ১১:৫৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫২৫ বার পড়া হয়েছে
বিনোদন রিপোর্টার : লালনের গান আর ফরিদা পারভীনের কণ্ঠ—বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে যেন এক অবিচ্ছেদ্য জুটি। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ কিংবা ‘মিলন হবে কত দিনে’—এসব গান তাঁর কণ্ঠে পেয়েছিল আলাদা এক আবেগ ও দর্শন। প্রয়াণের এক বছর পরও সেই কণ্ঠ শ্রোতাদের মনে একইভাবে অনুরণিত হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে সংগীতাঙ্গনে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে লালনগীতির অন্যতম প্রধান শিল্পী হিসেবে।
ফরিদা পারভীনের সংগীতজীবনে বড় পরিবর্তন আসে লালনের গানকে কেন্দ্র করে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় দোল পূর্ণিমার এক অনুষ্ঠানে গুরু মোকছেদ আলীর অনুরোধে তিনি প্রথম লালনগীতি পরিবেশন করেন। গানটি ছিল ‘সত্য বল সুপথে চল’।

প্রথমদিকে লালনের গান নিয়ে বিশেষ আগ্রহ না থাকলেও পরিবেশনার পর তাঁর মনে তৈরি হয় গভীর টান। এরপর লালনের দর্শন ও গান নিয়ে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সাধনা। ধীরে ধীরে এই ধারাই তাঁর শিল্পীসত্তার অন্যতম পরিচয় হয়ে ওঠে।
কণ্ঠে পেয়েছিল নতুন প্রাণ:
লালনের গানকে শুধু মঞ্চে পরিবেশন করেই থেমে থাকেননি ফরিদা পারভীন। নিজের স্বতন্ত্র গায়কী দিয়ে তিনি এসব গানকে পৌঁছে দেন দেশের নানা প্রান্তের শ্রোতার কাছে। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান হয়ে ওঠে একই সঙ্গে সুর, অনুভূতি ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রকাশ।
শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা এবং বাংলার লোকজ সংগীতের শিকড়—দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁর পরিবেশনার নিজস্ব ধরন। ফলে লালনের দর্শনভিত্তিক গানগুলো তাঁর কণ্ঠে পেয়েছিল গভীরতা ও আবেগের ভিন্ন মাত্রা।
‘লালন কন্যা’ থেকে কিংবদন্তি:

শ্রোতাদের ভালোবাসায় ফরিদা পারভীন পরিচিতি পান ‘লালন কন্যা’ ও ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ নামে। তবে তিনি নিজেকে কোনো উপাধির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। লালনের গানকে তিনি দেখেছেন আত্মজিজ্ঞাসা ও মানুষের অন্তর্জগতকে বোঝার একটি মাধ্যম হিসেবে।
তাঁর গাওয়া ‘অচিন পাখি’ কিংবা ‘আরশিনগর’ তাই কেবল জনপ্রিয় গান হয়ে থাকেনি; বহু শ্রোতার কাছে এগুলো হয়ে উঠেছে নিজেকে জানার ও জীবনের অর্থ খোঁজার অনুষঙ্গ।
রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় স্বীকৃতি:
দীর্ঘ সংগীতজীবনে ফরিদা পারভীন পেয়েছেন নানা সম্মাননা। ১৯৮৭ সালে তিনি দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক লাভ করেন। চলচ্চিত্রেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর স্বীকৃতি পান।
দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের লোকসংগীতকে তুলে ধরেছেন এই শিল্পী। তবে পুরস্কার ও সম্মাননার বাইরেও কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার ভালোবাসাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে আছে।
ফরিদা পারভীনের চলে যাওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ থেমে নেই। নতুন শ্রোতারা তাঁর গান শুনছেন, পুরোনো শ্রোতারা ফিরে যাচ্ছেন তাঁর গানের কাছে। লালনের দর্শন ও বাংলার লোকসংগীতের যে স্বতন্ত্র সুর তিনি ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন, সেটিই তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে মানুষের স্মৃতিতে।
শিল্পী চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়। ফরিদা পারভীনের ক্ষেত্রেও তাই—তিনি নেই, অথচ তাঁর কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো এখনো বয়ে নিয়ে চলেছে তাঁর শিল্পীসত্তার অমলিন স্মৃতি।
প্রিন্ট























