ঢাকা ১১:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo পরাজয় জেনেও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী অলি আহমদ Logo এ্যানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সালাহউদ্দিন এলজিআরডি মন্ত্রী! Logo রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন মির্জা ফখরুল Logo ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, আজই মিলবে উত্তর Logo জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ লোডশেডিং, বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলার শঙ্কা Logo আজ ১২ আগস্ট আরাফাত রহমান কোকোর জন্মদিন Logo আগামীকাল ১২ আগস্ট আকাশে দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ : রোমাঞ্চকর ক্ষণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব। Logo আজ জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হবে। Logo আজ থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ আবেদন শুরু । চলবে আগামী ১৭ আগস্ট পর্যন্ত। Logo বিশ্বকাপে সরাসরি কোয়ালিফাই করেছে বাংলাদেশ
ক্ষমতার খুব কাছে থেকেও ক্ষমতার মোহে না জড়িয়ে যিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্রীড়াঙ্গণ- আরাফাত রহমান কোকোর জীবন ও শেষ বিদায়ের গল্প

আরাফাত রহমান কোকো: নীরবে চলে যাওয়া এক নিভৃতচারী ক্রীড়া সংগঠকের গল্প

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৫:৫১:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৬৬৫ বার পড়া হয়েছে

২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। ঢাকার গুলশানে গৃহবন্দী এক মায়ের কাছে এলো জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সংবাদ। প্রায় সত্তর বছরের সেই মায়ের পাশে তখন পরিবারের কোনো সদস্য নেই। নেই এমন কোনো স্বজন বা সতীর্থ, যিনি তার মাথায় হাত রেখে বলতে পারেন- ‘মা, শক্ত হও।’

সেই মা ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আর যে সংবাদটি সেদিন তার হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল, সেটি ছিল তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ।

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কোকো। কয়েক দিন পর তার মরদেহ দেশে আনা হয় এবং ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও রাজধানীতে তার জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা হয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা।

কোকোর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক ছিল না; এটি ছিল এমন একজন মানুষের বিদায়, যিনি জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন প্রচারের আড়ালে। ক্ষমতার কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছাকাছি থেকেও যিনি নিজেকে ক্ষমতার প্রদর্শনী থেকে দূরে রেখেছিলেন।

জন্মের পরই যুদ্ধের বাস্তবতা

আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট। তার বাবা তখন কর্মসূত্রে কুমিল্লায় ছিলেন। জন্মের দেড় বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ প্রবেশ করে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়ে।

১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কোকোর বাবা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে ছোট্ট কোকো, মা খালেদা জিয়া ও বড় ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দিদশার সেই সময়টুকু ছিল তার শৈশবের এক নির্মম অধ্যায়।

অবশ্য দুই বছরের শিশুর পক্ষে বন্দিত্বের অর্থ বোঝা সম্ভব ছিল না। মুক্তির আনন্দও হয়তো তার শিশুমনে সেভাবে দাগ কাটেনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে শুরু করেন- তার শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দেশের জন্ম, একটি পরিবারের সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস।

বারবার বিয়োগান্তকতার মুখোমুখি এক জীবন

কোকোর জীবনে রাজনৈতিক ইতিহাস যেন বারবার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে ফিরে এসেছে।

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার সময় তার বাবা জিয়াউর রহমানও বন্দিত্বের মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তখন কোকো ছিলেন মাত্র ছয় বছরের শিশু।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে কোকোর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।

একটি শিশুর জীবনে বাবা হারানোর শোক কতটা গভীর হতে পারে, তা কল্পনা করা কঠিন। অথচ কোকোর জীবনের গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই তিনি মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- যে মানুষটি জীবনের বড় একটি সময় সংগ্রাম, রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যে কাটিয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

ক্ষমতার সন্তান, অথচ ক্ষমতার প্রদর্শনীতে অনাগ্রহী

আরাফাত রহমান কোকোর জীবনকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।

চাইলেই তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার নিকটবর্তী অবস্থানকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম আলোচিত বৈশিষ্ট্য ছিল অন্তর্মুখিতা ও প্রচারবিমুখতা।

তিনি রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে ক্রীড়াঙ্গণকে বেছে নিয়েছিলেন।

ক্রিকেট ছিল তার অন্যতম প্রধান আগ্রহ ও কর্মক্ষেত্র।

এখানেই কোকোর জীবনের একটি ভিন্ন অধ্যায় শুরু হয়।

ক্রিকেটে কোকোর নীরব ভূমিকা

২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় কোকো দেশের ক্রিকেট অবকাঠামো ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সংগ্রামে। জাতীয় দলের সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল নতুন ক্রিকেটার তৈরির একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা।

এই জায়গাতেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেট ও খেলোয়াড় উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডেভেলপমেন্ট কমিটির দায়িত্বে থেকে কোকো খেলোয়াড় তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে এই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার সুযোগ পান।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি ছিল অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়।

ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পদলোভন ছিল না

কোকোর চরিত্রের একটি দিক এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি চাইলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার পারিবারিক প্রভাবও তার ছিল। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। বরং যে দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সেই দায়িত্বের মধ্যেই থেকে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন।

ক্রিকেট প্রশাসনে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষদের সঙ্গে কাজ করার ঘটনাও তার সংগঠকসত্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আলোচিত হয়।

ক্ষমতার সঙ্গে থাকার অর্থ যে ক্ষমতার প্রদর্শন করা নয়-কোকোর কর্মকাণ্ডে তার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

মিরপুরের ক্রিকেট অবকাঠামো ও আধুনিকায়নের ভাবনা

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কোকো উপলব্ধি করেছিলেন। বর্ষাকালে বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে নিয়মিত ক্রিকেট আয়োজন ছিল কঠিন। মাঠে পানি জমে যাওয়া ছিল বড় সমস্যা।

মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে আধুনিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরবর্তীকালে এই মাঠই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক ভেন্যু- যা আজ ‘হোম অব ক্রিকেট’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিধি বাড়াতে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিকতা কমিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়েও ক্রিকেট অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বগুড়ার মতো শহরে ক্রিকেট অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সেই বৃহত্তর বিকেন্দ্রীকরণ ভাবনার অংশ ছিল।

চান্দু স্টেডিয়াম: একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত

বগুড়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যুর নামকরণও কোকোর সংগঠকসত্তার আলোচনায় আসে।

তার বাবা ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান। পারিবারিক আবেগকে সামনে রেখে স্টেডিয়ামের নামকরণে তার বাবার নাম ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও বগুড়ার স্টেডিয়ামের নাম দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ চান্দুর নামে।

অনেকের কাছে এই সিদ্ধান্ত কোকোর ব্যক্তিগত বিনয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রতীক হয়ে আছে।

ক্রিকেটে পেশাদারিত্বের ভাবনা

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিদেশি কোচ, ট্রেনার ও ফিজিওদের সম্পৃক্ততার পথ আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কোকোর লক্ষ্য ছিল ক্রিকেটকে শুধু আবেগের জায়গায় না রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মানের কাঠামোয় দাঁড় করাতে কোচিং, প্রশিক্ষণ, ফিটনেস, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট এবং অবকাঠামো- সবকিছুকে সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রদর্শন

২০০৪ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এত বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। এই আয়োজন বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

কোকো ছিলেন সেই সময়ের ক্রিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকদের একজন।

নীরব মানুষের শেষ বিদায়

তারপর এল ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। মালয়েশিয়ায় আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া।

একজন প্রচারবিমুখ মানুষের মৃত্যুর পর তাকে শেষবারের মতো দেখতে মানুষের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল বিস্ময়কর।

২৭ জানুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বায়তুল মোকাররমের আশপাশ, পল্টন, দৈনিক বাংলা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ এসেছিলেন শেষবারের মতো কোকোকে বিদায় জানাতে।

সেদিনের দৃশ্য যেন একটি প্রশ্নই সামনে এনেছিল- যে মানুষটি জীবদ্দশায় এতটা নীরবে ছিলেন, তার শেষ বিদায়ে এত মানুষ কেন?

উত্তরটি হয়তো তার ব্যক্তিত্বের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল। মানুষ সবসময় বড় পদকে ভালোবাসে না; মানুষ ভালোবাসে বিনয়কে, আন্তরিকতাকে এবং আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাকে।

কোকোর সবচেয়ে বড় পরিচয়- তিনি ছিলেন সাধারণ

আরাফাত রহমান কোকোর জীবন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। তার কর্মজীবন নিয়েও ভিন্নমত থাকতে পারে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতো তার জীবন নিয়েও আলোচনা ও সমালোচনা থাকবে।

কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই- তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত আলোচিত পরিবারের সদস্য, অথচ ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অনেকটাই প্রচারবিমুখ।

তিনি রাজনীতির সামনে নিজেকে দাঁড় করানোর পরিবর্তে ক্রীড়াঙ্গণে কাজ করেছেন। ক্ষমতার খুব কাছে থেকেও ক্ষমতার প্রদর্শনকে জীবনের মূল লক্ষ্য করেননি- এমন একটি ভাবমূর্তিই তার পরিচিতির অন্যতম অংশ হয়ে আছে।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এই যে, তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার হারিয়েছেন- শৈশবে বন্দিত্ব, কৈশোরে পিতৃহারা হওয়া, পরবর্তী জীবনে কারাবাস, দেশত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত অকালমৃত্যু। তবু তিনি নিজের ব্যক্তিগত কষ্টকে প্রকাশ্যে প্রদর্শনের পথ বেছে নেননি।

শেষ কথা

আরাফাত রহমান কোকো আজ ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তার জীবন ছিল মাত্র ৪৫ বছরের। কিন্তু সেই স্বল্প জীবনে তিনি দেখেছেন একটি দেশের জন্ম, পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, পিতার বন্দিত্ব, পিতার শাহাদাত, নিজের কারাবাস, দেশত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রবাসের মাটিতে মৃত্যু।

তিনি হয়তো রাজনীতির মঞ্চে বক্তৃতা দেননি। ক্ষমতার বড় কোনো পদে বসেননি। নিজের প্রচারের জন্য প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়াননি।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়নের ইতিহাসে তার সময়ের ভূমিকা আলোচিত থাকবে।

আর তার শেষ বিদায়ের সেই জনসমাগম প্রমাণ করে- মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সবসময় বড় পদ, বড় বক্তব্য কিংবা প্রচারের প্রয়োজন হয় না।

কখনো কখনো নীরবে কাজ করে যাওয়াই মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন নীরবে বেঁচে থাকা এক মানুষ; কিন্তু তার শেষ বিদায় বলে দিয়েছিল- একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়, তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সেই নিভৃতচারী ক্রীড়া সংগঠকের স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক

 


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

ক্ষমতার খুব কাছে থেকেও ক্ষমতার মোহে না জড়িয়ে যিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্রীড়াঙ্গণ- আরাফাত রহমান কোকোর জীবন ও শেষ বিদায়ের গল্প

আরাফাত রহমান কোকো: নীরবে চলে যাওয়া এক নিভৃতচারী ক্রীড়া সংগঠকের গল্প

আপডেট সময় ০৫:৫১:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। ঢাকার গুলশানে গৃহবন্দী এক মায়ের কাছে এলো জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সংবাদ। প্রায় সত্তর বছরের সেই মায়ের পাশে তখন পরিবারের কোনো সদস্য নেই। নেই এমন কোনো স্বজন বা সতীর্থ, যিনি তার মাথায় হাত রেখে বলতে পারেন- ‘মা, শক্ত হও।’

সেই মা ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আর যে সংবাদটি সেদিন তার হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল, সেটি ছিল তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ।

মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কোকো। কয়েক দিন পর তার মরদেহ দেশে আনা হয় এবং ২৭ জানুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা। রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও রাজধানীতে তার জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা হয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় ঘটনা।

কোকোর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক ছিল না; এটি ছিল এমন একজন মানুষের বিদায়, যিনি জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন প্রচারের আড়ালে। ক্ষমতার কেন্দ্রের অত্যন্ত কাছাকাছি থেকেও যিনি নিজেকে ক্ষমতার প্রদর্শনী থেকে দূরে রেখেছিলেন।

জন্মের পরই যুদ্ধের বাস্তবতা

আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট। তার বাবা তখন কর্মসূত্রে কুমিল্লায় ছিলেন। জন্মের দেড় বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ প্রবেশ করে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়ে।

১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কোকোর বাবা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে ছোট্ট কোকো, মা খালেদা জিয়া ও বড় ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি হন।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দিদশার সেই সময়টুকু ছিল তার শৈশবের এক নির্মম অধ্যায়।

অবশ্য দুই বছরের শিশুর পক্ষে বন্দিত্বের অর্থ বোঝা সম্ভব ছিল না। মুক্তির আনন্দও হয়তো তার শিশুমনে সেভাবে দাগ কাটেনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে শুরু করেন- তার শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি দেশের জন্ম, একটি পরিবারের সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস।

বারবার বিয়োগান্তকতার মুখোমুখি এক জীবন

কোকোর জীবনে রাজনৈতিক ইতিহাস যেন বারবার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে ফিরে এসেছে।

১৯৭৫ সালের নভেম্বরের রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার সময় তার বাবা জিয়াউর রহমানও বন্দিত্বের মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। তখন কোকো ছিলেন মাত্র ছয় বছরের শিশু।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হলে কোকোর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।

একটি শিশুর জীবনে বাবা হারানোর শোক কতটা গভীর হতে পারে, তা কল্পনা করা কঠিন। অথচ কোকোর জীবনের গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি গ্রেপ্তার হন। কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই তিনি মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বসবাস শুরু করেন।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- যে মানুষটি জীবনের বড় একটি সময় সংগ্রাম, রাজনৈতিক চাপ ও প্রতিকূলতার মধ্যে কাটিয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

ক্ষমতার সন্তান, অথচ ক্ষমতার প্রদর্শনীতে অনাগ্রহী

আরাফাত রহমান কোকোর জীবনকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান।

চাইলেই তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার নিকটবর্তী অবস্থানকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের অন্যতম আলোচিত বৈশিষ্ট্য ছিল অন্তর্মুখিতা ও প্রচারবিমুখতা।

তিনি রাজনীতির মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরিবর্তে ক্রীড়াঙ্গণকে বেছে নিয়েছিলেন।

ক্রিকেট ছিল তার অন্যতম প্রধান আগ্রহ ও কর্মক্ষেত্র।

এখানেই কোকোর জীবনের একটি ভিন্ন অধ্যায় শুরু হয়।

ক্রিকেটে কোকোর নীরব ভূমিকা

২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় কোকো দেশের ক্রিকেট অবকাঠামো ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সংগ্রামে। জাতীয় দলের সাফল্যের পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল নতুন ক্রিকেটার তৈরির একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা।

এই জায়গাতেই বয়সভিত্তিক ক্রিকেট ও খেলোয়াড় উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডেভেলপমেন্ট কমিটির দায়িত্বে থেকে কোকো খেলোয়াড় তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে এই উন্নয়ন কাঠামোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসার সুযোগ পান।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি ছিল অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়।

ক্ষমতা ছিল, কিন্তু পদলোভন ছিল না

কোকোর চরিত্রের একটি দিক এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি চাইলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সর্বোচ্চ পদে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার পারিবারিক প্রভাবও তার ছিল। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। বরং যে দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সেই দায়িত্বের মধ্যেই থেকে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন।

ক্রিকেট প্রশাসনে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষদের সঙ্গে কাজ করার ঘটনাও তার সংগঠকসত্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আলোচিত হয়।

ক্ষমতার সঙ্গে থাকার অর্থ যে ক্ষমতার প্রদর্শন করা নয়-কোকোর কর্মকাণ্ডে তার একটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

মিরপুরের ক্রিকেট অবকাঠামো ও আধুনিকায়নের ভাবনা

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা কোকো উপলব্ধি করেছিলেন। বর্ষাকালে বাংলাদেশের আবহাওয়ার কারণে নিয়মিত ক্রিকেট আয়োজন ছিল কঠিন। মাঠে পানি জমে যাওয়া ছিল বড় সমস্যা।

মিরপুরের শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে আধুনিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পরবর্তীকালে এই মাঠই হয়ে ওঠে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক ভেন্যু- যা আজ ‘হোম অব ক্রিকেট’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিধি বাড়াতে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিকতা কমিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়েও ক্রিকেট অবকাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বগুড়ার মতো শহরে ক্রিকেট অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও সেই বৃহত্তর বিকেন্দ্রীকরণ ভাবনার অংশ ছিল।

চান্দু স্টেডিয়াম: একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত

বগুড়ার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যুর নামকরণও কোকোর সংগঠকসত্তার আলোচনায় আসে।

তার বাবা ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান। পারিবারিক আবেগকে সামনে রেখে স্টেডিয়ামের নামকরণে তার বাবার নাম ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও বগুড়ার স্টেডিয়ামের নাম দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ চান্দুর নামে।

অনেকের কাছে এই সিদ্ধান্ত কোকোর ব্যক্তিগত বিনয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি প্রতীক হয়ে আছে।

ক্রিকেটে পেশাদারিত্বের ভাবনা

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিদেশি কোচ, ট্রেনার ও ফিজিওদের সম্পৃক্ততার পথ আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

কোকোর লক্ষ্য ছিল ক্রিকেটকে শুধু আবেগের জায়গায় না রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসা।

বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক মানের কাঠামোয় দাঁড় করাতে কোচিং, প্রশিক্ষণ, ফিটনেস, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট এবং অবকাঠামো- সবকিছুকে সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রদর্শন

২০০৪ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এত বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মহলে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়। এই আয়োজন বাংলাদেশের ক্রিকেট অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

কোকো ছিলেন সেই সময়ের ক্রিকেট প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকদের একজন।

নীরব মানুষের শেষ বিদায়

তারপর এল ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। মালয়েশিয়ায় আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বাংলাদেশে নেমে আসে শোকের ছায়া।

একজন প্রচারবিমুখ মানুষের মৃত্যুর পর তাকে শেষবারের মতো দেখতে মানুষের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল বিস্ময়কর।

২৭ জানুয়ারি ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় তার নামাজে জানাজা।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বায়তুল মোকাররমের আশপাশ, পল্টন, দৈনিক বাংলা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ এসেছিলেন শেষবারের মতো কোকোকে বিদায় জানাতে।

সেদিনের দৃশ্য যেন একটি প্রশ্নই সামনে এনেছিল- যে মানুষটি জীবদ্দশায় এতটা নীরবে ছিলেন, তার শেষ বিদায়ে এত মানুষ কেন?

উত্তরটি হয়তো তার ব্যক্তিত্বের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল। মানুষ সবসময় বড় পদকে ভালোবাসে না; মানুষ ভালোবাসে বিনয়কে, আন্তরিকতাকে এবং আপন করে নেওয়ার ক্ষমতাকে।

কোকোর সবচেয়ে বড় পরিচয়- তিনি ছিলেন সাধারণ

আরাফাত রহমান কোকোর জীবন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতে পারে। তার কর্মজীবন নিয়েও ভিন্নমত থাকতে পারে। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মতো তার জীবন নিয়েও আলোচনা ও সমালোচনা থাকবে।

কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই- তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত আলোচিত পরিবারের সদস্য, অথচ ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অনেকটাই প্রচারবিমুখ।

তিনি রাজনীতির সামনে নিজেকে দাঁড় করানোর পরিবর্তে ক্রীড়াঙ্গণে কাজ করেছেন। ক্ষমতার খুব কাছে থেকেও ক্ষমতার প্রদর্শনকে জীবনের মূল লক্ষ্য করেননি- এমন একটি ভাবমূর্তিই তার পরিচিতির অন্যতম অংশ হয়ে আছে।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি সম্ভবত এই যে, তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার হারিয়েছেন- শৈশবে বন্দিত্ব, কৈশোরে পিতৃহারা হওয়া, পরবর্তী জীবনে কারাবাস, দেশত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত অকালমৃত্যু। তবু তিনি নিজের ব্যক্তিগত কষ্টকে প্রকাশ্যে প্রদর্শনের পথ বেছে নেননি।

শেষ কথা

আরাফাত রহমান কোকো আজ ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তার জীবন ছিল মাত্র ৪৫ বছরের। কিন্তু সেই স্বল্প জীবনে তিনি দেখেছেন একটি দেশের জন্ম, পরিবারের রাজনৈতিক উত্থান-পতন, পিতার বন্দিত্ব, পিতার শাহাদাত, নিজের কারাবাস, দেশত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত প্রবাসের মাটিতে মৃত্যু।

তিনি হয়তো রাজনীতির মঞ্চে বক্তৃতা দেননি। ক্ষমতার বড় কোনো পদে বসেননি। নিজের প্রচারের জন্য প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে দাঁড়াননি।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো ও খেলোয়াড় উন্নয়নের ইতিহাসে তার সময়ের ভূমিকা আলোচিত থাকবে।

আর তার শেষ বিদায়ের সেই জনসমাগম প্রমাণ করে- মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে সবসময় বড় পদ, বড় বক্তব্য কিংবা প্রচারের প্রয়োজন হয় না।

কখনো কখনো নীরবে কাজ করে যাওয়াই মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন নীরবে বেঁচে থাকা এক মানুষ; কিন্তু তার শেষ বিদায় বলে দিয়েছিল- একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়, তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সেই নিভৃতচারী ক্রীড়া সংগঠকের স্মৃতির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক

 


প্রিন্ট