দুঃসময়ের দীর্ঘ অবস্থান, রাজনৈতিক সংগ্রাম, সাংগঠনিক দায়িত্ব ও নেতৃত্বের এক দীর্ঘ পথের গল্প
রুহুল কবির রিজভী: নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন থেকে জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে
- আপডেট সময় ০৮:১৪:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৭১৭ বার পড়া হয়েছে
রাজনীতিতে কিছু পথ শুধু পায়ে হাঁটা হয় না; কিছু পথ তৈরি হয় অপেক্ষা, প্রতিকূলতা, ত্যাগ, দায়িত্ব ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। কোনো কোনো রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন কেবল পদ-পদবি দিয়ে করা যায় না। বরং দেখতে হয়- দুঃসময়ে কে কোথায় ছিলেন, সংকটের মুহূর্তে কে সংগঠনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, কে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে রাজনৈতিক দায়িত্বকে বড় করে দেখেছিলেন।
রুহুল কবির রিজভীর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাকে ঘিরে এমন প্রশ্ন তুললে বারবার ফিরে আসে একটি স্থান ও একটি সংখ্যা- নয়াপল্টন এবং ৭৮৭ দিন।
২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করেছিলেন রিজভী। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ এই সময় তিনি কার্যত দলীয় কার্যালয়কেই নিজের আবাসস্থলে পরিণত করেছিলেন। ২০২০ সালের ২৬ মার্চ ৭৮৭ দিন পর তিনি কার্যালয় ছেড়ে বাসায় ফিরে যান।
৭৮৭ দিন- শুনতে এটি নিছক একটি সংখ্যা। কিন্তু রাজনীতির অভিধানে এই সংখ্যা একটি সময়ের প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলীয় সংকট, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস, মামলা-গ্রেপ্তারের চাপ, দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন এবং সংগঠনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
আজ, সেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রিজভী বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। ফলে নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন থেকে জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে তাঁর পৌঁছানোর গল্পটি কেবল ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গল্প নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা, আনুগত্য ও নেতৃত্বের বিবর্তন বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা।
নয়াপল্টন যখন হয়ে উঠেছিল ঠিকানা
২০১৮ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, মামলা-গ্রেপ্তার এবং খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছিল।
৩০ জানুয়ারি রাতে রিজভী নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান নেন। কয়েক দিন পর, ৮ ফেব্রুয়ারি, খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান। রাজনৈতিক পরিস্থিতির সেই টানাপোড়েনের মধ্যেই রিজভীর কার্যালয়ে অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়।
একটি রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সাধারণত সভা, বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন, সাংগঠনিক সমন্বয় ও নেতা-কর্মীদের যোগাযোগের জায়গা। কিন্তু রিজভীর ক্ষেত্রে নয়াপল্টন হয়ে উঠেছিল একই সঙ্গে কর্মস্থল, রাজনৈতিক যোগাযোগের কেন্দ্র এবং আবাসস্থল।
দিনের পর দিন, রাতের পর রাত- একটি অফিসকক্ষের মধ্যেই চলেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন।
রাজনীতিতে ‘অবস্থান’ সাধারণত একটি কর্মসূচির নাম। কিন্তু রিজভীর ক্ষেত্রে অবস্থান শব্দটি একসময় আক্ষরিক অর্থেই জীবনযাপনের অংশ হয়ে যায়।
৭৮৭ দিন শুধু বসে থাকার গল্প নয়
একজন মানুষ ৭৮৭ দিন একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে ছিলেন- এই তথ্য নিঃসন্দেহে বিস্ময় জাগায়। কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু ‘অফিসবাস’ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যের বড় একটি অংশ অনালোচিত থেকে যায়।
কারণ তিনি সেখানে শুধু ছিলেন না; দায়িত্বও পালন করেছেন। নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, দলীয় বক্তব্য তুলে ধরা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানানো এবং বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সক্রিয় ছিলেন। সে সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিরোধী রাজনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ রাজনৈতিক কর্মসূচি মাঠে থাকলেও সেটির বক্তব্য যদি মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে রাজনৈতিক যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
নয়াপল্টনের সেই কার্যালয় তাই এক অর্থে হয়ে উঠেছিল বিএনপির রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের একটি দৃশ্যমান কেন্দ্র। আর রিজভী ছিলেন সেই কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ।
একটি কক্ষ, আর বাইরে উত্তাল রাজনীতি
নয়াপল্টনের ব্যস্ত রাস্তার বাইরে তখন রাজনীতির নানা টানাপোড়েন। আর কার্যালয়ের ভেতরে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন একজন নেতা।
কখনো সাংবাদিকদের ভিড়, কখনো নেতা-কর্মীদের আনাগোনা, কখনো সংবাদ সম্মেলন, কখনো দলীয় বৈঠক- এই ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের জীবন।
স্বাভাবিক জীবনে মানুষ দিনের শেষে নিজের ঘরে ফেরে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। উৎসব আসে, ঈদ আসে, ব্যক্তিগত আনন্দ আসে। কিন্তু রিজভীর সেই সময়ের জীবন ছিল অন্যরকম।
সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নয়াপল্টনের কার্যালয়েই তিনি একাধিক ঈদ কাটিয়েছেন। এই তথ্যটি ৭৮৭ দিনের রাজনৈতিক হিসাবকে একটি মানবিক মাত্রা দেয়। কারণ রাজনীতির পরিসংখ্যানে ৭৮৭ দিন হয়তো একটি সংখ্যা। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে ৭৮৭ দিন মানে ২ বছরেরও বেশি সময়- অসংখ্য সকাল, রাত, উৎসব, অপেক্ষা এবং পারিবারিক মুহূর্ত।
পরিবার থেকে দূরে, সংগঠনের কাছে
রাজনীতির ত্যাগ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু ত্যাগের সবচেয়ে কঠিন জায়গা অনেক সময় দৃশ্যমান নয়- তা হলো ব্যক্তিগত জীবন।
নিজের ঘর ছেড়ে দীর্ঘদিন দলীয় কার্যালয়ে থাকা কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার থেকে দূরত্ব, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের সীমাবদ্ধতা এবং অনিশ্চিত জীবনযাপন।
রিজভীর ৭৮৭ দিনের অবস্থানকে তাঁর সমর্থকেরা তাই রাজনৈতিক ত্যাগ ও দলীয় আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন।
অন্যদিকে একজন বিশ্লেষকের জন্য এটিকে দেখতে হবে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে- একটি রাজনৈতিক সংকটের সময়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সংগঠনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান হিসেবে।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি পাশাপাশি রাখলেই ঘটনাটির পূর্ণ রাজনৈতিক অর্থ বোঝা সম্ভব।
খালেদা জিয়ার কারাবাসের সঙ্গে এক প্রতীকী যোগসূত্র
রিজভীর নয়াপল্টন অধ্যায়কে ২০১৮-২০২০ সালের বিএনপির রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে আলাদা করা কঠিন।
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ খালেদা জিয়ার কারাবাস বিএনপির রাজনীতিতে বড় একটি সংকট তৈরি করে। তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দলীয় প্রতিক্রিয়া- সবকিছুই তখন বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়।
এরপর ২০২০ সালের মার্চে খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। আর ২৬ মার্চ রিজভীও ৭৮৭ দিন পর নয়াপল্টনের কার্যালয় ছেড়ে বাসায় ফেরেন।
সময়গত এই যোগসূত্রটি ঘটনাটিকে একটি বিশেষ প্রতীকী অর্থ দিয়েছে।
যে রাজনৈতিক সংকটের আবহে তাঁর নয়াপল্টনে অবস্থান শুরু হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরই সেই অবস্থানেরও সমাপ্তি ঘটে।
সংগ্রামের গল্প ২০১৮-তে শুরু হয়নি
রিজভীর রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস অবশ্য ৭৮৭ দিনের নয়াপল্টন অধ্যায়ের চেয়ে অনেক পুরোনো।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও যুক্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক দায়িত্বের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে। একজন নেতার বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে তাঁর দীর্ঘ সাংগঠনিক পথচলা এবং ব্যক্তিগত ঝুঁকির ঘটনাগুলোও বিবেচনায় আসে।
এই জায়গা থেকেই নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিনকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ সংগ্রামী ধারাবাহিকতার একটি দৃশ্যমান অধ্যায় হিসেবে দেখা যায়।
মুখপাত্র থেকে সংগঠনের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ
রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর দীর্ঘদিনের মুখপাত্রের ভূমিকা।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দলের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলীয় কর্মসূচি, সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরতে সংবাদমাধ্যমের সামনে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ছিল।
রাজনীতিতে মুখপাত্র হওয়া শুধু বক্তব্য দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দলের রাজনৈতিক বার্তা নির্ধারিত ভাষায় তুলে ধরা, গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং সংকটের সময়ে সংগঠনের দৃশ্যমান উপস্থিতি বজায় রাখা।
নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিনের সময় তাঁর এই ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়েছিল।
অর্থাৎ তিনি একদিকে কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন, অন্যদিকে সেই কার্যালয় থেকেই দলের রাজনৈতিক যোগাযোগ সচল রাখছিলেন।
৭৮৭ দিনের পরও থামেনি রাজনৈতিক পথ
নয়াপল্টনের সেই দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হওয়ার পরও রিজভীর রাজনৈতিক পথচলা থেমে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর ওপর দলের সাংগঠনিক দায়িত্বও বেড়েছে।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে। দলীয় ঘোষণায় নজরুল ইসলাম খানকে চেয়ারম্যান এবং রুহুল কবির রিজভীকে সদস্যসচিব করা হয়।
একটি জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা নিছক একটি প্রশাসনিক কাজ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রার্থী নির্বাচন, মাঠপর্যায়ের সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়, প্রচার, যোগাযোগ, রাজনৈতিক বার্তা এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের সম্পর্ক বজায় রাখা।
দীর্ঘদিন দলীয় যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার অভিজ্ঞতা এই দায়িত্ব পালনে রিজভীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আর এবার জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ যাত্রায় ২০২৬ সালের আগস্টে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়- বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি।
১৫ আগস্ট ২০২৬ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভীসহ চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করার খবর প্রকাশিত হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
জাতীয় স্থায়ী কমিটি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। ফলে এই কমিটিতে রিজভীর অন্তর্ভুক্তি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক মাইলফলক।
এখানেই নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিনের গল্পটি নতুন তাৎপর্য পায়।
একসময় যিনি দলীয় সংকটের সময়ে কার্যালয় ছেড়ে যাননি, দীর্ঘদিন সেখান থেকে দলের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, সময়ের পরিক্রমায় তিনিই এখন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অংশ।
এটিকে শুধু একটি পদপ্রাপ্তির ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো গল্পের গভীরতা কমে যায়। বরং এটি দেখা যেতে পারে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং দলের ভেতরে অর্জিত আস্থার একটি নতুন পর্যায় হিসেবে।
নয়াপল্টন থেকে স্থায়ী কমিটি- একটি রাজনৈতিক রেখাচিত্র
রিজভীর রাজনৈতিক জীবনকে যদি একটি রেখাচিত্রে সাজানো হয়, তাহলে সেখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু স্পষ্ট হয়ে ওঠে-
আন্দোলনের রাজনীতি → রাজনৈতিক ঝুঁকি ও আঘাত → দীর্ঘ সাংগঠনিক দায়িত্ব → নয়াপল্টনে ৭৮৭ দিনের অবস্থান → মুখপাত্র হিসেবে দীর্ঘ ভূমিকা → নির্বাচনী দায়িত্ব → জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি।
এই ধারাবাহিকতা একটি রাজনৈতিক জীবনের বিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতিতে কোনো পদ হঠাৎ আসে না। তার পেছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের কাজ, সম্পর্ক, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক আস্থার সঞ্চয়।
২০১৮ সালে নয়াপল্টনের একটি কক্ষে বসে দলের বক্তব্য দেওয়া এবং ২০২৬ সালে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়া- এই দুই দৃশ্যের মাঝখানে রয়েছে প্রায় এক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস।
ত্যাগের রাজনীতি: আবেগের বাইরে বাস্তব মূল্যায়ন
‘ত্যাগ’ শব্দটি রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু ত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হয়।
রিজভীর সমর্থকেরা তাঁর ৭৮৭ দিনের অবস্থানকে ত্যাগ, আনুগত্য ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে দেখেন। অন্য রাজনৈতিক মতের মানুষ এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারেন। গণতান্ত্রিক সমাজে এমন ভিন্ন মূল্যায়ন স্বাভাবিক। কিন্তু একটি তথ্য অস্বীকার করা কঠিন- ৭৮৭ দিন দীর্ঘ সময়।
একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে দুই বছরের বেশি সময় অবস্থান করা, সেখান থেকে নিয়মিত রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করা এবং ব্যক্তিগত জীবন থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকা নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।
সেই কারণেই নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন রিজভীর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।
ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত কী থাকে?
রাজনৈতিক ইতিহাস তাৎক্ষণিক প্রশংসা কিংবা সমালোচনায় শেষ হয় না। সময়ের দূরত্ব তৈরি হলে ইতিহাস অনেক বেশি নির্মোহ হয়ে ওঠে।
কোনো নেতার রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, কেউ নাও হতে পারেন। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব, কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক পথচলার তথ্যগুলোও ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে।
রিজভীর নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন সেই অর্থে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়ের দলিল।
এটি শুধু একজন নেতার দীর্ঘ অফিসবাস নয়। এর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে একটি রাজনৈতিক দলের সংকটকাল, বিরোধী রাজনীতির বাস্তবতা, দলীয় যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা এবং একজন নেতার ব্যক্তিগত জীবনের ওপর রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রভাব।
শেষ কথা: ৭৮৭ দিন থেকে নতুন দায়িত্বের পথে
রাজনীতিতে পদ আসে, পদ চলে যায়। ক্ষমতার সমীকরণ বদলায়। আজকের গুরুত্বপূর্ণ নেতা কাল হয়তো প্রান্তে চলে যেতে পারেন। আবার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর কেউ উঠে আসতে পারেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রের দিকে। কিন্তু দুঃসময়ের স্মৃতি সহজে মুছে যায় না।
রুহুল কবির রিজভীর ক্ষেত্রে নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন সেই স্মৃতিরই একটি শক্তিশালী প্রতীক।
২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি যখন তিনি বাসা ছেড়ে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, তখন হয়তো কেউ জানতেন না- এই অবস্থান একদিন ৭৮৭ দিনের ইতিহাস হয়ে উঠবে। কেউ জানতেন না, একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ের ছোট কক্ষ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের এত বড় প্রতীকে পরিণত হবে।
আর হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করেননি- সেই নয়াপল্টনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে বহু বছর পর তিনি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির মতো সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে জায়গা পাবেন।
কিন্তু রাজনীতির পথ এমনই। কখনো একটি ছোট কক্ষ ইতিহাসের বড় প্রতীকে পরিণত হয়। কখনো দীর্ঘ অপেক্ষা নেতৃত্বের নতুন দরজা খুলে দেয়। কখনো দুঃসময়ে সংগঠনের পাশে থাকা একটি অধ্যায় পরবর্তী রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
রিজভীর ক্ষেত্রে নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন তাই শুধু একটি সময়কাল নয়- এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি দৃশ্যমান প্রতীক।
একজন নেতা কত বড় পদে ছিলেন, ইতিহাস হয়তো একদিন তার হিসাব করবে। কিন্তু সংকটের দিনে তিনি কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন- এই প্রশ্নও রাজনৈতিক মূল্যায়নে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় নয়াপল্টনের সেই ৭৮৭ দিনে।
নয়াপল্টনের ৭৮৭ দিন থেকে জাতীয় স্থায়ী কমিটি- এটি তাই কেবল একটি রাজনৈতিক পদযাত্রা নয়; এটি একজন নেতার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিযাত্রার প্রতীকী রেখাচিত্র।
সময়ই শেষ পর্যন্ত বিচার করবে এই যাত্রার রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা গভীর। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই ইতিহাসের পাতায় স্পষ্ট- দুঃসময়ের নয়াপল্টন আর আজকের জাতীয় স্থায়ী কমিটি- এই দুই প্রান্তের মাঝখানে রুহুল কবির রিজভীর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ এক অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
প্রিন্ট



















